কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে বিশ্বজুড়ে ডাটা সেন্টারের আকার, জটিলতা এবং নির্মাণ ব্যয় অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে বীমা খাত নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে—যেখানে ঝুঁকি ও সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ এত দ্রুত বাড়ছে যে, বীমা ও পুনর্বীমা বাজার তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। সুইস রি-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি আধুনিক এআই ডাটা সেন্টার নির্মাণে ব্যয় ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। পরবর্তীতে এতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (GPU) ও অন্যান্য প্রযুক্তি সংযোজনের পর প্রকল্পের মোট মূল্য দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। ফলে একটি মাত্র স্থাপনার জন্যই বিপুল পরিমাণ বীমা কভার প্রয়োজন হয়, যা বর্তমান পুনর্বীমা বাজারের জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
বীমা সক্ষমতার সঙ্গে ব্যয়ের বৈষম্য
ডাটা সেন্টার প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সাধারণত পুরো নির্মাণমূল্যের জন্য বীমা কভার বাধ্যতামূলক থাকে। কিন্তু বাস্তবে পুনর্বীমা বাজার অনেক সময় প্রতিযোগিতামূলক দামে সেই পূর্ণ কভার দিতে সক্ষম হয় না। ফলে বীমা কোম্পানিগুলোকে আংশিক ঝুঁকি বহন করতে হচ্ছে, যা তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বব্যাপী ডাটা সেন্টার বীমার প্রিমিয়াম দ্রুত বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাতের প্রিমিয়াম ১০.৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৪.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
ঝুঁকির নতুন মাত্রা: অবস্থান ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ
ডাটা সেন্টারের ঝুঁকি শুধু তাদের আকার বা ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এগুলো কোথায় নির্মিত হচ্ছে সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৫% ডাটা সেন্টার এমন এলাকায় অবস্থিত, যেখানে বছরে অন্তত তিনদিন বড় শিলাবৃষ্টির ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি প্রায় ৪০% ডাটা সেন্টার এমন অঞ্চলে রয়েছে, যেখানে শক্তিশালী টর্নেডোর সম্ভাবনা বিদ্যমান।
এতে একক কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে একাধিক ডাটা সেন্টারে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়, বিশেষ করে যখন একই অঞ্চলে একাধিক স্থাপনা গড়ে তোলা হয়।
অগ্নিকাণ্ড ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি
ডাটা সেন্টারে অগ্নিকাণ্ড একটি বড় উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গত ১৫ বছরের তথ্য অনুযায়ী, মোট ক্ষয়ক্ষতির ঘটনার মাত্র ১০.৯% অগ্নিকাণ্ডের কারণে ঘটলেও, মোট আর্থিক ক্ষতির ৪২.৩% এই খাত থেকেই এসেছে।
নতুন প্রজন্মের ডাটা সেন্টারগুলোতে সার্ভার র্যাকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সংযোজন করা হচ্ছে, যা বিদ্যুৎ ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে এই প্রযুক্তি অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, কারণ এটি ডাটা রুমের ভেতরেই সম্ভাব্য আগুনের উৎস তৈরি করছে।
পানি ও শীতলীকরণ ঝুঁকি
ডাটা সেন্টারে পানি-সম্পর্কিত ক্ষতিও একটি বড় উদ্বেগ। গত ১৫ বছরের বিশ্লেষণে দেখা যায়—
| ঝুঁকির ধরন |
মোট ক্ষতির অংশ (%) |
| অগ্নিকাণ্ড |
৪২.৩% |
| তরলজনিত ক্ষতি |
প্রায় ২৪% |
| স্প্রিংকলার লিকেজ |
৯.৩% |
| কুলিং সিস্টেম লিক |
প্রায় ১০% |
এআই সার্ভারগুলো বেশি তাপ উৎপাদন করে এবং সরাসরি চিপে তরল শীতলীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এতে লিকেজ, স্থাপন ত্রুটি এবং রক্ষণাবেক্ষণজনিত ব্যর্থতার ঝুঁকি বাড়ছে।
বিদ্যুৎ ও ব্যবসা বিঘ্নের ঝুঁকি
ডাটা সেন্টারের আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো ব্যবসা বিঘ্ন (Business Interruption)। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়া ডাটা সেন্টার অচল হওয়ার প্রধান কারণ, যা মোট ঘটনার প্রায় ৪৫%। এআই সার্ভার প্রতি র্যাকে ১০০ কিলোওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, যেখানে প্রচলিত সার্ভারের জন্য প্রয়োজন হয় মাত্র ৫ থেকে ১৫ কিলোওয়াট।
এই বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে ডাটা সেন্টারগুলো নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করছে, যা আবার নতুন করে অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ ও বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বীমা খাতে নতুন জটিলতা
ডাটা সেন্টারের ক্ষেত্রে ‘অ্যাকিউমুলেশন রিস্ক’ বা সম্মিলিত ঝুঁকি একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। অনেক সময় একটি ডাটা সেন্টারের ভবন, যন্ত্রপাতি এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আলাদা আলাদা বীমা কাভারের আওতায় থাকে। ফলে একটি দুর্ঘটনা একাধিক পলিসিতে দাবি সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়া, একই অবকাঠামো—যেমন বিদ্যুৎ, কুলিং বা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা—একাধিক গ্রাহকের জন্য ব্যবহৃত হওয়ায় একটি ঘটনার প্রভাব একাধিক প্রতিষ্ঠানের ওপর একযোগে পড়তে পারে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে বলা যায়, এআই-চালিত ডাটা সেন্টারের দ্রুত বিস্তার বীমা খাতের জন্য এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। উচ্চ ব্যয়, জটিল প্রযুক্তি এবং বহুমাত্রিক ঝুঁকির কারণে প্রচলিত বীমা কাঠামো এখন চাপের মুখে। এই পরিস্থিতিতে বীমা ও পুনর্বীমা খাতকে আরও উদ্ভাবনী, সমন্বিত এবং ঝুঁকিসচেতন কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের এই উচ্চমূল্যের অবকাঠামোগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়।