সাগরঘেঁষা উপকূলীয় জেলা বরগুনায় একের পর এক সংক্রামক রোগের দাপটে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এক সময় ডেঙ্গু, এরপর হাম, আর বর্তমানে ডায়রিয়ার প্রকোপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জেলার স্বাস্থ্যব্যবস্থা। মৌসুম বদলালেও রোগের ধরণ বদলালেও আতঙ্কের মাত্রা কমছে না, বরং নতুন করে বাড়ছে উদ্বেগ।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ডেঙ্গুতে বরগুনা ছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর একটি। প্রায় নয় হাজার সাতশ ঊনপঞ্চাশ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মৃত্যুর সংখ্যাও ছিল পঞ্চাশের কাছাকাছি। সেই ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই এবার হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, যেখানে ইতোমধ্যে তিনটি শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত করেছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। বর্তমানে ডায়রিয়াও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডায়রিয়ায় দুই হাজার সাতশ তিনজন আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে দুই হাজার চারশ একাশি জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে গত এক সপ্তাহেই চার শতাধিক নতুন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। গত চব্বিশ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ছিয়ানব্বই জন, যাদের মধ্যে সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিপ্পান্ন জন। এদের মধ্যে একুশ জন শিশু এবং একুশ জন নারী রয়েছেন।
রোগের বর্তমান পরিসংখ্যান
| রোগের নাম |
আক্রান্ত সংখ্যা |
সুস্থ |
সাম্প্রতিক ভর্তি |
মৃত্যু |
| ডেঙ্গু |
৯,৭৪৯ |
নির্দিষ্ট নয় |
তথ্য নেই |
৫০ এর কম |
| হাম |
বৃদ্ধি পাচ্ছে |
নির্দিষ্ট নয় |
চলমান |
৩ শিশু |
| ডায়রিয়া |
২,৭০৩ |
২,৪৮১ |
৯৬ (২৪ ঘণ্টায়) |
নেই |
বিশেষজ্ঞদের মতে, বরগুনায় বারবার সংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ার মূল কারণ হলো নিরাপদ পানির সংকট, পুষ্টিহীনতা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার ঘাটতি। উপকূলীয় এই জেলায় অধিকাংশ মানুষকে দূষিত পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। গরম মৌসুমে এই সংকট আরও তীব্র হয়ে ওঠে, যার ফলে ডায়রিয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
অন্যদিকে, টিকাদান কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও অনেক অভিভাবক শিশুদের নির্ধারিত সময়ে পূর্ণ টিকা দিতে অবহেলা করেন। বিশেষ করে ৯ মাসের পর ১৫ মাসের টিকা না নেওয়ার কারণে রোগ প্রতিরোধে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। একই সঙ্গে অনেক মা অপুষ্টিতে ভোগায় শিশুদের শরীরও জন্ম থেকেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
বরগুনা জেলা হাসপাতালের ২৫০ শয্যার সুবিধা এখন চরম চাপের মুখে। হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু করা হলেও শয্যা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। রোগীদের অনেককে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সদের মতে, একসঙ্গে ডেঙ্গু, হাম ও ডায়রিয়ার চাপ সামলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বরগুনাকে হাম সংক্রমণের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। জেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে ২১ দিনব্যাপী প্রচার ও টিকাদান কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে ডায়রিয়া প্রতিরোধে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত রোগ নির্ণয় ও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার জন্য নমুনা রাজধানীতে পাঠাতে হয়, ফলে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয় এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই রোগচক্র ভাঙতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু সচেতনতা নয়, বরং নিরাপদ পানি সরবরাহ, পুষ্টি উন্নয়ন এবং টিকাদান নিশ্চিত করাই হতে পারে স্থায়ী সমাধানের পথ।