খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
দেশের অর্থবাজারে সুদের হার নির্ধারণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ব্যাংক-ঘোষিত রেফারেন্স রেটভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে সরে এসে এবার বাস্তব লেনদেননির্ভর আধুনিক মানদণ্ড চালু করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সুরক্ষিত ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেটের (SOFR) আদলে গঠিত এই নতুন কাঠামো আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে।
এই নতুন ব্যবস্থার অধীনে সুদের হার আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংকের অনুমান বা ঘোষণার ওপর নির্ভর করবে না। বরং আন্তঃব্যাংক বাজারে সংঘটিত বাস্তব লেনদেনের ভিত্তিতে প্রতিদিনের গড় হার নির্ধারণ করা হবে, যা সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, এতদিন প্রচলিত ঢাকা ইন্টারব্যাংক অফার রেট (DIBOR) অনেকাংশেই ব্যাংকগুলোর স্বপ্রণোদিত তথ্যের ওপর নির্ভর করত। ফলে কিছু ব্যাংকের তথ্য অনিয়মিতভাবে জমা হওয়ায় প্রকৃত বাজার পরিস্থিতি সবসময় প্রতিফলিত হতো না।
এই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই নতুন কাঠামোতে সম্পূর্ণ লেনদেনভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে, যা বাজারের প্রকৃত তারল্য, ঝুঁকি ও অর্থের প্রকৃত খরচকে আরও সঠিকভাবে তুলে ধরবে।
নতুন ব্যবস্থায় দুই ধরনের পৃথক রেফারেন্স রেট চালু করা হচ্ছে, যা একসঙ্গে বাজারের বাস্তব চিত্র তুলে ধরবে।
প্রথমটি হলো বাংলাদেশ ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট (BOFR), যা জামানতভিত্তিক বা সুরক্ষিত লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে। দ্বিতীয়টি হলো ঢাকা ওভারনাইট মানি মার্কেট রেট, যা জামানতবিহীন আন্তঃব্যাংক কলমানি লেনদেনের ভিত্তিতে তৈরি হবে।
এই দুই রেট একত্রে বাজারে স্বল্পমেয়াদি অর্থের প্রকৃত মূল্য, ঝুঁকি প্রিমিয়াম এবং তারল্য পরিস্থিতি আরও পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করবে।
নতুন কাঠামোতে সুদের হার নির্ধারণে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও পরিসংখ্যানভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। প্রতিদিনের লেনদেনের পরিমাণ অনুযায়ী গড় হার নির্ধারণ করা হবে এবং অস্বাভাবিক বা বিচ্ছিন্ন লেনদেনের প্রভাব কমাতে বিশেষ পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে।
কোনো দিন পর্যাপ্ত লেনদেন না থাকলে আগের কার্যদিবসের তথ্য যুক্ত করে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হবে, যাতে বাজারের প্রবণতা বিকৃত না হয়।
নিচের সারণিতে নতুন ব্যবস্থার কাঠামো তুলে ধরা হলো—
| রেফারেন্স রেট | ভিত্তি | মেয়াদ | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|
| বাংলাদেশ ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট (BOFR) | জামানতভিত্তিক লেনদেন | ওভারনাইট, ১ সপ্তাহ | নিরাপদ লেনদেনভিত্তিক হার |
| ঢাকা ওভারনাইট মানি মার্কেট রেট | জামানতবিহীন কলমানি লেনদেন | ওভারনাইট, ১ সপ্তাহ, ১ মাস, ৩ মাস | ঝুঁকি ও তারল্য প্রতিফলন |
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই সংস্কারের মাধ্যমে দেশের আর্থিক বাজারে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সুদের মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে ঋণের সুদ নির্ধারণ, সরকারি ও বেসরকারি বন্ডের মূল্যায়ন এবং ভাসমান সুদের পণ্যের হিসাব আরও বাস্তবসম্মত হবে।
একই সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ধরনের বিনিয়োগ ও ঋণপণ্য চালু করতে পারবে, যা বাজারকে আরও গতিশীল করবে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের অর্থবাজার আরও বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এই রেফারেন্স রেট প্রস্তুত করা হচ্ছিল। এখন থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়ে প্রতিদিন সকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে এবং তা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বাস্তব প্রয়োগের পর নিয়মিত পর্যালোচনা ও পরিমার্জনের মাধ্যমে এই কাঠামো আরও উন্নত করা হবে, যাতে দেশের অর্থবাজার দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও কার্যকর থাকে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সুদের হার নির্ধারণে এই নতুন সংস্কার বাংলাদেশের আর্থিক খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা বাজারকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক এবং তথ্যনির্ভর ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নেবে।