খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 3শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ১৬ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
মা-বাবার অধিকতর স্নেহ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে এক স্কুলছাত্রীর সঙ্গে ভয়াবহ প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। তথাকথিত তান্ত্রিক ও কবিরাজি চিকিৎসার ফাঁদে ফেলে ওই কিশোরীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মূল হোতাসহ এক প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। বৃহস্পতিবার দুপুরে জামালপুর পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
ভুক্তভোগী কিশোরী শেরপুর জেলার একজন কাপড় ব্যবসায়ীর সন্তান এবং স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সে সবার বড়। তদন্ত সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ওই কিশোরীর মনে হচ্ছিল যে তার মা-বাবা তাকে ছোট ভাই-বোনদের তুলনায় কম ভালোবাসেন। এই মানসিক অস্থিরতা ও একাকীত্ব থেকে মুক্তি পেতে সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে থাকে।
একপর্যায়ে ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটকে মো. খোরশেদ (২৯) নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়, যে নিজেকে তান্ত্রিক হিসেবে দাবি করে। পরবর্তীতে খোরশেদ ও তার সহযোগীরা ‘কবিরাজ’ এবং ‘আল্লাহর দান’ নামক একাধিক ইমু (Imo) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কিশোরীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। তারা তাকে আশ্বস্ত করে যে, তান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মা-বাবার পূর্ণ ভালোবাসা ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।
প্রতারক চক্রটি কিশোরীর সরলতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ধাপে তার কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতে শুরু করে। তারা কবিরাজ ফি, খাসি কোরবানি, জায়নামাজ, আগরবাতি, মোমবাতি, দুধ ও ফল কেনার অজুহাতে গত ৬ মার্চ থেকে ৯ মার্চের মধ্যে বিকাশের মাধ্যমে মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার ১৫০ টাকা আদায় করে।
পরবর্তীতে আরও বড় অংকের লাভের আশায় তারা কিশোরীকে প্রলুব্ধ করে পরিবারের গচ্ছিত স্বর্ণালংকার নিয়ে আসতে বলে। প্রতারকদের কথা অনুযায়ী, কিশোরী বাড়ি থেকে সাড়ে ২৭ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ এক লাখ টাকা তাদের হাতে তুলে দেয়। পুরো ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে যখন ওই কিশোরী পুনরায় টাকা পাঠাতে একটি বিকাশের দোকানে যায়। একজন অল্পবয়সী কিশোরীর হাতে এত টাকা দেখে দোকানদারের সন্দেহ হয় এবং তিনি বিষয়টি তার বাবাকে অবহিত করেন।
কিশোরীর বাবার দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে পিবিআই সদর দপ্তরের নির্দেশনায় তদন্ত শুরু হয়। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের মূল হোতাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিচে এই সংক্রান্ত তথ্যের একটি সারণি দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| প্রধান গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি | মনির হোসেন (২১), পিতা: অজ্ঞাত, চর যথার্থপুর, জামালপুর। |
| পেশাগত পরিচয় | কনটেন্ট ক্রিয়েটর (ফেসবুক পেজ: মেড ইন জামালপুর)। |
| অন্যান্য সহযোগী | মুছা মিয়া (২৯) ও রফিকুল ইসলাম (২৮)। |
| উদ্ধারকৃত স্বর্ণ | ২৫ ভরি ৯ আনা ৪ রতি (মাটির নিচে পুঁতে রাখা অবস্থায়)। |
| জব্দকৃত সরঞ্জাম | ৫টি মোবাইল ফোন (১টি আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সসহ)। |
| উদ্ধারকৃত মালের মূল্য | আনুমানিক ৬৪ লক্ষ টাকা। |
পিবিআই জামালপুরের পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত জানান, প্রযুক্তির সহায়তায় প্রথমে গাজীপুর থেকে মুছা ও রফিকুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ময়মনসিংহ থেকে মূল হোতা মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মনিরের দেওয়া তথ্যে তার বাড়ির পাশের বাগান থেকে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা স্বর্ণালংকারগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই ঘটনায় জড়িত চক্রের অন্য সদস্যদের ধরতেও অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানানো হয়েছে।