খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন কাঠামো গড়ে উঠছে। এর অংশ হিসেবে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস সনদ এবং সবুজ বীমা খাত বাংলাদেশে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে বলা হচ্ছে, এই দুটি খাত সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে দেশটি বছরে প্রায় একশ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হতে পারে।
কার্বন নিঃসরণ হ্রাস সনদ এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, যেখানে এক টন কার্বন নিঃসরণ কমালে একটি সনদ পাওয়া যায়। এই সনদ বৈশ্বিক বাজারে বিক্রি করে আয় করা সম্ভব হয়। উন্নত দেশ ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নির্ধারিত নিঃসরণ সীমা পূরণের জন্য এসব সনদ ক্রয় করে থাকে।
বাংলাদেশ এই ব্যবস্থায় প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নেয় দুই হাজার ছয় সালে, অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে। এরপর থেকে দেশটি প্রায় পঁচিশ লক্ষ ত্রিশ হাজার কার্বন সনদ বিক্রি করে প্রায় এক কোটি সত্তর লক্ষ মার্কিন ডলার আয় করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আয় দেশের প্রকৃত সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম।
বিশ্বব্যাপী কার্বন সনদের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে, দুই হাজার ত্রিশ সালের মধ্যে এই বাজার কয়েক লক্ষ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ফলে বাংলাদেশের জন্য এই খাতে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে আয় বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে দেশে দুইশ আশি টিরও বেশি পরিবেশবান্ধব সনদপ্রাপ্ত কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে অনেক কারখানা উচ্চ মানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
বিশ্বের শীর্ষ একশটি পরিবেশবান্ধব কারখানার মধ্যে ঊনসত্তরটি বাংলাদেশে অবস্থিত, যা দেশের শিল্পখাতের পরিবেশবান্ধব উৎপাদন সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মান অর্জনের প্রমাণ বহন করে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকে ঝুঁকিমুক্ত করতে সবুজ বীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং বাজার ঝুঁকির সম্মুখীন হয়।
বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় এক হাজার তিনশ পনেরো মেগাওয়াট, যার প্রায় সাতাত্তর শতাংশ সৌরশক্তি নির্ভর। দুই হাজার ত্রিশ সালের লক্ষ্য অর্জনে প্রতি বছর প্রায় একশ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই বিপুল বিনিয়োগ সুরক্ষায় কার্যকর বীমা কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুই হাজার ছাব্বিশ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন সীমান্ত সমন্বয় ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হবে। এই ব্যবস্থার অধীনে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই ইউরোপীয় বাজারে হওয়ায় এই নীতির প্রভাব দেশের রপ্তানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ হবে। ফলে শিল্প উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণ এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা | ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা |
|---|---|---|
| কার্বন সনদ থেকে আয় | প্রায় এক কোটি সত্তর লক্ষ মার্কিন ডলার | বছরে প্রায় একশ কোটি মার্কিন ডলার |
| পরিবেশবান্ধব কারখানা | দুইশ আশি টিরও বেশি | আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা |
| নবায়নযোগ্য জ্বালানি ক্ষমতা | এক হাজার তিনশ পনেরো মেগাওয়াট | সম্প্রসারণ প্রয়োজন |
| রপ্তানি বাজার নির্ভরতা | ইউরোপীয় বাজারে প্রায় অর্ধেক | নীতি পরিবর্তনের প্রভাব উচ্চ |
এই খাতে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দেশে এখনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় কার্বন নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। নীতিমালা ও আইনি কাঠামোও সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কার্বন যাচাই ও মূল্যায়নের সক্ষম প্রতিষ্ঠানও সীমিত।
সবুজ প্রকল্পের জন্য বীমা প্রিমিয়াম নির্ধারণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও দক্ষতার অভাবও একটি বড় বাধা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত নীতি গ্রহণ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা গেলে বাংলাদেশ এই উদীয়মান সবুজ অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান অর্জন করতে পারবে।