কুয়েত, মালয়েশিয়া ও লিবিয়ায় মৃত্যুবরণ করা ৩৪ জন বাংলাদেশি প্রবাসীর মরদেহ একদিনে দেশে ফিরেছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) পৃথক ফ্লাইটে এসব মরদেহ ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। স্বজনদের আহাজারিতে বিমানবন্দরের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফিরিয়ে আনা সকল প্রবাসীর মৃত্যু স্বাভাবিক কারণে হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার চলমান অস্থির পরিস্থিতির কারণে কিছু মরদেহ সংশ্লিষ্ট দেশে দীর্ঘ সময় আটকে ছিল, যা কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে আনা সম্ভব হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফেরা মরদেহগুলোর মধ্যে কুয়েত থেকে সর্বাধিক ৩০ জন, মালয়েশিয়া থেকে ২ জন এবং লিবিয়া থেকে ২ জন প্রবাসী রয়েছেন।
দেশভিত্তিক মরদেহের সংখ্যা
| দেশ |
মৃত প্রবাসীর সংখ্যা |
মন্তব্য |
| কুয়েত |
৩০ জন |
দীর্ঘদিন আটকে থাকা মরদেহ অন্তর্ভুক্ত |
| মালয়েশিয়া |
২ জন |
স্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা |
| লিবিয়া |
২ জন |
নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল অঞ্চল |
| মোট |
৩৪ জন |
একদিনে দেশে প্রত্যাবর্তন |
দাফন ও আর্থিক সহায়তা
বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণ ও স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের সময় সরকারের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিটি মৃত প্রবাসীর পরিবারকে দাফন ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট পরিবার যদি কোনো প্রকার জীবনবীমা বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধার জন্য যোগ্য হয়ে থাকে, তবে সেসব পাওনা দ্রুততম সময়ে পরিশোধ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রশাসনিক উপস্থিতি ও প্রক্রিয়া
মরদেহ গ্রহণের সময় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মরদেহগুলো যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রবাসী কল্যাণ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদেশে মারা যাওয়া বাংলাদেশিদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য দূতাবাসগুলো নিয়মিতভাবে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
প্রবাসী মৃত্যুর বাস্তবতা
প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রবাসে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন, যার বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ঘটে থাকে। এসব মৃত্যুর পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক অসুস্থতা, দুর্ঘটনা এবং কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বিশেষ করে কুয়েত, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও লিবিয়ার মতো দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কর্মরত থাকায় সেখানে মৃত্যুর ঘটনাও তুলনামূলক বেশি ঘটে।
স্বজনদের আবেগ ও প্রতিক্রিয়া
বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণের সময় একাধিক পরিবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকেই দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফিরলেও তাদের জীবিত ফিরে না আসার বেদনায় শোকাহত হয়ে পড়েন।
স্বজনদের দাবি, বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য আরও উন্নত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা কমানো যায়।
সার্বিক পরিস্থিতি
এক দিনে ৩৪ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমজীবী মানুষের জীবনের বাস্তবতা ও ঝুঁকিকে আবারও সামনে এনেছে। অর্থনৈতিক কারণে বিদেশে কাজ করতে যাওয়া এই মানুষগুলোর মৃত্যুর পর পরিবারের ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ আরও বেড়ে যায়।
সরকারি সহায়তা থাকলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রবাসীদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সংকটকালীন ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে এই ঘটনা প্রবাসী কল্যাণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি নতুন করে মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।