মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রভাব হরমুজ প্রণালিতে গভীরভাবে পড়েছে বলে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়। এই পরিস্থিতিতে ইরান প্রণালিটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ “বাংলার জয়যাত্রা” ইরানের অনুমতি না পাওয়ায় হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারছে না।
বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের মালিকানাধীন এই জাহাজটি বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এতে প্রায় সাইত্রিশ হাজার টন সার রয়েছে। জাহাজটি মূলত হরমুজ প্রণালি পার হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবান বন্দরের দিকে যাওয়ার কথা ছিল।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও যোগাযোগ
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান গত উনিশ এপ্রিল তুরস্কে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জাহাজটির নিরাপদ চলাচলের অনুরোধ জানান। এর আগে ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে একাধিক বৈঠকেও বিষয়টি উত্থাপন করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পাওয়ায় দুই দফা চেষ্টা করেও জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারেনি।
একই সময়ে কেম্যান দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী আরেকটি জাহাজ সৌদি আরবের একটি বন্দর থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে চট্টগ্রামে আসার কথা থাকলেও সেটিও ইরানের অনুমতি না পাওয়ায় যাত্রা সম্পন্ন করতে পারেনি।
ইরানের অবস্থান ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বাংলাদেশের কিছু কূটনৈতিক অবস্থানের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে বাংলাদেশের দুই দফা বিবৃতি তেহরানের মনোভাবকে প্রভাবিত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে অসন্তোষের কথা জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কিছু বক্তব্য ইরানের কাছে স্পষ্ট অবস্থান হিসেবে প্রতীয়মান হয়নি।
গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপঞ্জি
| সময় |
ঘটনা |
বিবরণ |
| জানুয়ারি শেষ |
জাহাজ হরমুজ অঞ্চলে প্রবেশ |
“বাংলার জয়যাত্রা” মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে |
| ফেব্রুয়ারি শেষ |
দুবাই বন্দরে উপস্থিতি |
কাতার থেকে পণ্য নিয়ে জাহাজ দুবাই পৌঁছে |
| ফেব্রুয়ারি শেষ |
সংঘাতের প্রভাব |
জাহাজের কাছাকাছি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে |
| এপ্রিল শুরু |
প্রথম অনুমতির দাবি |
হরমুজ অতিক্রমের জন্য ইরানের অনুমতি প্রত্যাখ্যান |
| এপ্রিল মধ্যভাগ |
পুনরায় চেষ্টা |
দুই দফা চেষ্টা ব্যর্থ হয় |
| এপ্রিল উনিশ |
কূটনৈতিক বৈঠক |
তুরস্কে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা |
জাহাজের বর্তমান অবস্থা
জাহাজটি বর্তমানে নিরাপত্তাজনিত কারণে গভীর সমুদ্র এলাকায় অবস্থান করছে। আরব আমিরাতের উপকূলরক্ষী বাহিনীর নির্দেশনার পর এটি নির্ধারিত বন্দরে প্রবেশ করতে পারেনি। পরে ইরানের সাময়িক অনুমতি প্রত্যাহারের ফলে জাহাজটি হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখ থেকে ফিরে আসে।
বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং দ্রুত সমাধানের আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষণধর্মী প্রেক্ষাপট
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ বা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সাধারণত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখে। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে প্রকাশিত বিবৃতিগুলো নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি হওয়ায় ইরানের পক্ষ থেকে অনাগ্রহ দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।