খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 13শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৬ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার বর্তমানে এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ ঘাটতি এবং চাহিদার ওঠানামা একসঙ্গে বাজারকে প্রভাবিত করছে। সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সংঘাত ও নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ায় তেলের দামে ব্যাপক ওঠানামা দেখা গেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এক পর্যায়ে অপরিশোধিত ব্রেন্ট তেলের দাম ১০ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৯০ ডলারে নেমে এলেও অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। পরবর্তীতে আক্রমণ ও উত্তেজনার কারণে দাম আবার বেড়ে ১০০ ডলারের ওপরে ওঠে এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির পর এটি সর্বোচ্চ ১১৯ ডলারে পৌঁছায়। বর্তমানে দাম প্রায় ১০৫ ডলারের আশেপাশে অবস্থান করছে, যা এখনো উচ্চমাত্রার অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়।
যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর পর প্রায় ৫০ দিনে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। প্রায় ৫৫ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে পৌঁছাতে পারেনি, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ। একই সময়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহও মাসে প্রায় ৭০ লাখ টন কমে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে ভাসমান মজুত দ্রুত কমে যাওয়ায় বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়া অঞ্চলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে, কারণ উপসাগরীয় রপ্তানির বড় অংশই এই অঞ্চলে যায়।
| বিষয় | পূর্ববর্তী অবস্থা | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|---|
| অপরিশোধিত তেল (প্রতি ব্যারেল) | ৯০–১১৯ ডলার | প্রায় ১০৫ ডলার |
| পেট্রল (এশিয়া) | ৮০ ডলার | ১২০ ডলার |
| ডিজেল (এশিয়া) | ৯৩ ডলার | ১৭৫ ডলার |
| জেট ফুয়েল | ৯৪ ডলার | ২০০ ডলারের বেশি |
এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো তাদের কৌশলগত মজুত দ্রুত ব্যবহার করছে। কিছু দেশে জ্বালানি রেশনিং ও ঘরে থেকে কাজের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শোধনাগারগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হওয়ায় দৈনিক কয়েক লাখ ব্যারেল কম উৎপাদন হচ্ছে।
চীনের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। তাদের বিশাল মজুত থাকলেও তারা তা ব্যবহার না করে বরং বাজারে সরবরাহ কমিয়ে রেখেছে, যা বৈশ্বিক ঘাটতি আরও বাড়াচ্ছে।
ইউরোপ তুলনামূলকভাবে চাহিদা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। অনেক দেশ ভর্তুকি ও কর ছাড় দিয়ে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখছে। তবে উচ্চ দামে কাঁচামাল কিনতে গিয়ে শোধনাগারগুলো মুনাফা হারাচ্ছে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি প্রধান সমস্যা সামনে এসেছে—সরবরাহ কমে যাওয়া, শোধনাগারের উৎপাদন হ্রাস এবং চাহিদার কৃত্রিম উচ্চতা। এই তিনটি বিষয় একত্রে বাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বৈশ্বিকভাবে প্রায় ১৫০ কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যা বার্ষিক উৎপাদনের একটি বড় অংশ।
তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন ব্যয়, খাদ্য মূল্য এবং উৎপাদন খরচ সবই বেড়ে যায়। উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ তাদের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে এবং মুদ্রার মান দুর্বল হয়। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এক জটিল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দ্রুত সমাধান না এলে অর্থনৈতিক চাপ আরও গভীর হতে পারে।