খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২০ মে ২০২৬
রাজধানীর মিরপুর এলাকার পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে পাশবিক নির্যাতন ও শ্বাসরোধ করে হত্যার মামলায় এক গুরুত্বপূর্ণ আইনি অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। মামলার দ্বিতীয় আসামি এবং প্রধান অভিযুক্ত মো. সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে (২৬) আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। গত বুধবার (২০ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালত এই আদেশ প্রদান করেন। অন্যদিকে, একই মামলার প্রধান আসামি মো. সোহেল রানা (৩০) ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি গত ১৯ মে পল্লবীর মিল্লাত ক্যাম্প সংলগ্ন একটি বহুতল ভবনে সংঘটিত হয়েছিল, যা স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
মামলার নথিপত্র ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ মে ঘটনার পর পরই পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানার পাশাপাশি তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে গ্রহণ করে। পরবর্তীতে রামিসার বাবার দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বুধবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান আসামি স্বপ্না আক্তারকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করেন। তদন্ত কর্মকর্তা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে কারাগারে আটক রাখার জন্য আদালতে একটি লিখিত আবেদন পেশ করেন। উভয় পক্ষের শুনানি ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আদালতের বিচারক মো. আশরাফুল হক তদন্ত কর্মকর্তার আবেদন মঞ্জুর করেন এবং আসামি স্বপ্না আক্তারকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
আদালত ও পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পল্লবীর এই আলোচিত শিশু হত্যা মামলায় স্বপ্নার বিরুদ্ধে অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগটি বর্তমানে নিবিড়ভাবে তদন্তাধীন রয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের নিকট স্বপ্না আক্তার দাবি করেছেন যে, ঘটনার সময় তিনি নিজ ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন এবং পার্শ্ববর্তী কক্ষে বা দরজার বাইরে কী ঘটেছিল সে সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন না। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময়কার সামগ্রিক পরিস্থিতি, ভুক্তভোগী পরিবারের তাৎক্ষণিক দরজায় কড়া নাড়ার ঘটনা এবং উদ্ধারকৃত প্রাথমিক আলামতের সঙ্গে স্বপ্নার দেওয়া জবানবন্দি ও বক্তব্যের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অপরাধের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া কিংবা আলামত লোপাটের ক্ষেত্রে তার কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
একই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত প্রধান আসামি মো. সোহেল রানাকে বুধবার পৃথক আরেকটি আদালতে হাজির করা হয়। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে আসামিকে হাজির করা হলে তিনি বিজ্ঞ বিচারকের নিকট স্বেচ্ছায় নিজের অপরাধ স্বীকার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এরপর ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা মোতাবেক আসামি সোহেল রানা শিশু রামিসাকে জোরপূর্বক নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন ও পরবর্তীতে প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার বিবরণ দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে আদালত তাকেও কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে পল্লবীর মিল্লাত ক্যাম্প সংলগ্ন একটি বহুতল ভবনে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনার দিন রামিসা তার নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া বড় বোন রাইসা আক্তারের অলক্ষ্যে তার পিছু নিয়ে ঘরের বাইরে বের হলে সামনের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা তাকে জোরপূর্বক নিজের ঘরে টেনে নিয়ে যান। দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর ওই ফ্ল্যাট থেকে রামিসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই নির্মম ও পাশবিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেন। দায়েরকৃত এই হত্যা মামলায় মো. সোহেল রানা, তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার এবং অজ্ঞাতনামা আরও একজনকে আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং ঘটনার নেপথ্যের সমস্ত তথ্য উদঘাটনে পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।