খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২০ মে ২০২৬
রাজধানীর মিরপুর এলাকার পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে পাশবিক নির্যাতন ও শ্বাসরোধ করে হত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। নিহত রামিসা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সে পল্লবীর মিল্লাত ক্যাম্প সংলগ্ন একটি বহুতল ভবনে তার বাবা, মা এবং নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া বড় বোন রাইসা আক্তারের সঙ্গে একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে বসবাস করত। গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, বড় বোনের অলক্ষ্যে তার পিছু নিয়ে ঘরের বাইরে আসাই শিশুটির জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। ঘটনার পর থেকে স্থানীয় এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
পারিবারিক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তার তাদের বর্তমান বাসস্থান থেকে সামান্য দূরত্বে অবস্থিত চাচার বাসায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। সে সময় ছোট বোন রামিসাও তার সঙ্গে যাওয়ার জন্য জেদ ধরে এবং বড় বোনের পেছনে পেছনে যাওয়ার চেষ্টা করে। রাইসা তাকে বাইরে যেতে নিষেধ করে এবং ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানায়। একপর্যায়ে রামিসাকে ঘরের ভেতরে রেখে রাইসা দরজা আটকে দিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের অলক্ষ্যে গোপনে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। তবে রামিসা বড় বোনের চলে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে তাকে অনুসরণ করার উদ্দেশ্যে নিজে ঘরের দরজা খুলে বাইরে চলে আসে।
ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের ফ্ল্যাটের ঠিক বিপরীত দিকে অবস্থিত সামনের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩০) দরজার বাইরে অবস্থান করছিলেন। তিনি সাত বছর বয়সী রামিসাকে একা পেয়ে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে নিজের ফ্ল্যাটের ভেতরে নিয়ে যান। অন্যদিকে রাইসা যখন চাচার বাসায় পৌঁছায়, তখনো সে জানত না যে তার ছোট বোন তার অলক্ষ্যে পেছনে এসে নিখোঁজ হয়েছে। কিছু সময় পর রাইসা চাচার বাসা থেকে নিজ ফ্ল্যাটে ফিরে আসলে পরিবারের সদস্যরা লক্ষ্য করেন যে রামিসা ঘরে নেই। তখনই তারা নিশ্চিত হন যে রামিসা চাচার বাসায় যায়নি এবং সে নিখোঁজ হয়েছে।
রামিসার সন্ধান না পেয়ে তার মা পারভিন আক্তার এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে ওই বহুতল ভবনের বিভিন্ন তলায় অনুসন্ধান শুরু করেন। তারা ভবনের প্রতিটি ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়েন এবং রামিসার সন্ধান করেন। ভবনের অন্য সব বাসিন্দা ও ভাড়াটিয়ারা দরজা খুলে তথ্য দিয়ে পরিবারটিকে সহযোগিতা করলেও, সামনের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (২৬) দীর্ঘক্ষণ তাদের ফ্ল্যাটের দরজা খোলেননি। পরিবারের সদস্যরা বারবার দরজা ধাক্কালেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ দেওয়া হয়নি। অভিযুক্তদের এই রহস্যময় ও সন্দেহজনক আচরণ পরবর্তীতে তাদের ওপর অপরাধের মূল সন্দেহ তৈরি করে।
ঘটনার বিষয়ে নিহত রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তার জানায়, সে যখন চাচার বাসায় যাচ্ছিল, তখন রামিসা তার সঙ্গে বের হতে চেয়েছিল। সে রামিসাকে ঘরে ফিরে যেতে বলে দ্রুত বের হয়ে যায়। রামিসা যে তার অলক্ষ্যে পেছনে পেছনে দরজার বাইরে চলে এসেছিল, তা সে লক্ষ্য করেনি। রাইসার ভাষ্যমতে, ঠিক তখনই দরজার বাইরে অবস্থান করা সোহেল রানা রামিসাকে টেনে তার ঘরে নিয়ে যান। জোরপূর্বক টেনে নেওয়ার সময় রামিসা চিৎকার করেছিল এবং সেই চিৎকারের শব্দ ঘর থেকে তাদের মা শুনতে পেয়েছিলেন।
রামিসার মা পারভিন আক্তার ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, “আমার মেয়েটি যখন চিৎকার দিচ্ছিল, তখন আমি বুঝতে পারিনি যে ওটা রামিসার কণ্ঠ ছিল। আমি ভেবেছিলাম ও বড় বোনের সঙ্গেই বাইরে গেছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর যখন বড় মেয়ে একা ফিরে আসে, তখনই আমি বুঝতে পারি কোনো বিপদ হয়েছে এবং খোঁজ শুরু করি। আমি সামনের ফ্ল্যাটের দরজা ধাক্কালেও সোহেল ও তার স্ত্রী দরজা খোলেনি।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, কয়েক মাস আগে ওই ফ্ল্যাটে ভাড়া আসা সোহেল রানার পরিবারের সঙ্গে তাদের পূর্ব কোনো শত্রুতা বা জানাশোনা ছিল না, এমনকি কখনো কোনো কথাও হয়নি।
ঘটনার পর পরিবারের পক্ষ থেকে পল্লবী থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ সন্দেহভাজন ওই ফ্ল্যাটের দরজা খুলে তল্লাশি চালায় এবং সেখান থেকে শিশু রামিসার মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তারা সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত করেছেন যে, শিশু রামিসাকে জোরপূর্বক ঘরে তুলে নিয়ে প্রথমে পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে এই জঘন্য অপরাধের আলামত ও প্রমাণ লোপাট করার উদ্দেশ্যে শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অপরাধে অভিযুক্ত সোহেল রানা এবং অপরাধে সহায়তার অভিযোগে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বুধবার (২০ মে) সকালে পল্লবীর মিল্লাত ক্যাম্প সংলগ্ন ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পুরো ভবন এবং আশেপাশের এলাকায় থমথমে ও শোকাবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ভবনটির প্রধান প্রবেশদ্বারে স্থানীয়দের উদ্যোগে একটি বিশাল ব্যানার ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে রামিসার হত্যাকারীদের জনসম্মুখে এনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করার দাবি জানানো হয়েছে। ভবনের নিচে এবং আশেপাশের রাস্তায় শত শত স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষুব্ধ জনতা ভিড় জমিয়েছেন। তারা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, একটি সাত বছরের অবুঝ শিশুকে যেভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে, তার বিচার দৃষ্টান্তমূলক হতে হবে যেন ভবিষ্যতে আর কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়। স্থানীয় বাসিন্দারা মামলার দ্রুত বিচার ও অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।