খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 15শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৮ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে কর্মরত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর রহস্য উদ্ঘাটন করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং যাত্রী সেজে ফাঁদ পেতে একটি পেশাদার ছিনতাইকারী চক্র এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে। এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চক্রের পাঁচ সদস্যকে কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—সোহাগ, ইসমাইল হোসেন জনি, ইমরান হোসেন হৃদয়, রাহাত হোসেন জুয়েল এবং সুজন। গ্রেপ্তারকৃত সকলেই কুমিল্লার কোতোয়ালি থানার বাসিন্দা।
সোমবার (২৭ এপ্রিল, ২০২৬) রাজধানীর কারওয়ান বাজারের র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী। তিনি জানান, বুলেটের ব্যাগ, মোবাইল ফোন এবং সামান্য কিছু টাকা ছিনিয়ে নিতেই ছিনতাইকারীরা এই ঘাতক পরিকল্পনা সাজিয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৪১তম বিসিএস (নন-ক্যাডার) কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী গত ১১ এপ্রিল ৪৪তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। প্রশিক্ষণ শেষে গত ২৪ এপ্রিল রাত আনুমানিক ১১টায় তিনি চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। রাত আনুমানিক ৩টার দিকে তিনি কুমিল্লার জাগুরঝুলি বিশ্বরোড এলাকায় এসে পৌঁছান। সেখান থেকে কুমিল্লা নগরের জাঙ্গালিয়া হয়ে রাজগঞ্জ এলাকার বাসায় ফেরার জন্য তিনি যানবাহনের অপেক্ষা করছিলেন।
পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছিনতাইকারী চক্রের সদস্য রাহাত হোসেন জুয়েল যাত্রী সেজে বুলেটের গন্তব্য জানতে চান। বুলেট জাঙ্গালিয়া যাবেন জানালে সোহাগ ও হৃদয় তাকে তাদের সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেন। অটোরিকশাটি বিশ্বরোড এলাকা ছেড়ে নির্জন পথে প্রবেশ করলে ভেতরে থাকা চক্রের অন্য সদস্যরা ধারালো অস্ত্রের মুখে তাকে জিম্মি করার চেষ্টা করেন। এ সময় বুলেট বৈরাগী বাধা প্রদান করলে সোহাগ, জনি ও হৃদয় তাকে চাপাতি ও সুইচ গিয়ার দিয়ে আঘাত করেন। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে ছিনতাইকারীরা বুলেটের ব্যাগ ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং চলন্ত অটোরিকশা থেকে তাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ী বিশ্বরোড সংলগ্ন একটি হোটেলের পাশে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। রাস্তার শক্ত পিচে মাথা ও মুখে গুরুতর আঘাত পাওয়ার ফলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর ২৫ এপ্রিল সকাল পৌনে ৯টায় ময়নামতি হাইওয়ে থানা পুলিশ কোটবাড়ী এলাকা থেকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে বুলেটের লাশ উদ্ধার করে। লাশের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত এবং প্রচণ্ড ঘর্ষণের একাধিক চিহ্ন ছিল। পরবর্তীতে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তার মা বাদী হয়ে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় র?্যাব-১১ এর একটি বিশেষ গোয়েন্দা দল ছায়া তদন্ত শুরু করে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রবিবার রাতভর অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি জব্দ করা ছাড়াও চাপাতি, সুইচ গিয়ার, হাতুড়ি এবং ছিনতাইকৃত আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের বাবুপাড়ার সুশীল বৈরাগীর ছেলে। তিনি তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। চাকরির সুবাদে তিনি কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার রাতে বাসস্ট্যান্ডে নামার পর বুলেট তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেছিলেন এবং খুব দ্রুত বাসায় পৌঁছাবেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার সেই আর ফেরা হয়নি। কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের ৪১তম বিসিএসের এই কর্মকর্তার অকাল মৃত্যুতে বিবিরবাজার স্থলবন্দরসহ রাজস্ব বিভাগে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে র?্যাব নিশ্চিত করেছে।