খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
রাজধানীর বছিলা পশুর হাটের ইজারা ও দরপত্র ক্রয় সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটন ওরফে নাঈম আহমেদ টিটন খুন হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় গত মঙ্গলবার রাতে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বুধবার (২৯ এপ্রিল) সকালে নিউমার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ৮-৯ জনকে আসামি করে এই মামলাটি করেন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে রাজধানীর নিউমার্কেট ১ নম্বর গেট সংলগ্ন বটতলা এলাকায় টিটনকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসীরা। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে বছিলা পশুর হাটের ইজারা নিয়ে বিরোধের বিষয়টি এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাহজাহান এবং রনি ওরফে ডাগারি রনির সঙ্গে টিটনের বিরোধের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, খন্দকার নঈম আহমেদ টিটন ২০০১ সালে সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় ২ নম্বরে ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক কারান্তরালে থাকার পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পান। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা হাট ইজারা সংক্রান্ত বিরোধ এর প্রধান কারণ হতে পারে।
৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কিলার আব্বাস, আরমান, সানজিদুল ইসলাম ইমন, পিচ্চি হেলাল, টিটন এবং ফ্রিডম রাসুর মতো শীর্ষ সন্ত্রাসীরা একে একে জামিনে মুক্তি পেলে রাজধানীর অপরাধ জগতে পুনরায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শুরু হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। টিটন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এই পুরনো বৈরিতা ও বর্তমান ব্যবসায়িক স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে পুলিশ।
মামলার এজাহারে নিহতের ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন উল্লেখ করেন, টিটন দীর্ঘ কারাবাসের পর মুক্তি পেয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অতীতের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন এবং সৎ পথে ব্যবসা করে জীবন গড়ার কথা বলেন। কয়েক দিন আগে টিটন তাঁর ভাইকে জানিয়েছিলেন যে, তিনি বছিলা পশুর হাটের ইজারা সংক্রান্ত দরপত্র (শিডিউল) কিনেছেন।
গত ২৬ এপ্রিল টিটন তাঁর ভাইকে জানিয়েছিলেন, এই হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলাল, কিলার বাদল, শাহজাহান ও রনির সঙ্গে তাঁর তীব্র বিরোধ চলছে। পরদিন ২৭ এপ্রিল তিনি পুনরায় ভাইকে জানান যে, বিরোধ মিটিয়ে ফেলার লক্ষ্যে তাঁকে একটি বৈঠকে (মিটিং) ডাকা হয়েছে। পরিবারের ধারণা, সেই আপস আলোচনার আড়ালেই ঘাতকরা তাঁর গতিবিধি অনুসরণ করে কিলিং মিশন সম্পন্ন করেছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের একটি নীল-নকশা বেরিয়ে এসেছে। জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতে টিটন যখন সুলতানগঞ্জ এলাকার বাসা থেকে বের হন, তখন থেকেই ঘাতকদের তিনটি টিম তাঁকে অনুসরণ করতে শুরু করে। ১. প্রথম টিম: সুলতানগঞ্জ এলাকা থেকে টিটনের পিছু নেয়। ২. দ্বিতীয় টিম: মোটরসাইকেলে করে টিটনকে সার্বক্ষণিক অনুসরণ করে। ৩. তৃতীয় টিম: নিউমার্কেট ১ নম্বর গেট এলাকায় আগে থেকেই অবস্থান নিয়েছিল।
নিউমার্কেটের বটতলার কাছে পৌঁছালে মোটরসাইকেল আরোহী ঘাতক দলটি টিটনকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। তদন্তকারীদের মতে, এই কিলিং মিশনে বাদল, শাহজাহান, ভাইগ্না রনি, সানি, সুমন, প্রিন্স, লম্বু আলম ও পারভেজ নামের অপরাধীরা অংশ নিয়েছিল।
টিটন হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে পুলিশ আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরনো কিছু হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র খুঁজছে। ১৯৯৯ সালে খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ আহমেদের ভাই টিপুকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়েছিল। ওই কিলিং মিশনে সানজিদুল ইসলাম ইমন, টিটন, লেদার লিটন ও মামুনসহ ছয়জন অংশ নিয়েছিলেন। এছাড়া ওই একই সময়ে ইমন বাহিনীর হাতে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অশ্রু এবং গুলশানের ট্রাম্প ক্লাবে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের সামনে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈফ মামুনকে একইভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশ মনে করছে, টিপু হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ এবং বছিলা হাটের আধিপত্য—এই দুই বিষয়ের মিশেলেই টিটনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বুধবার বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে টিটনের মরদেহ বুঝে নেন তাঁর ভাই রিপন। এ সময় সাংবাদিকদের কাছে তিনি পুনরায় পিচ্চি হেলালের সাথে বিরোধের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “টিটন আমাকে বলেছিল পিচ্চি হেলালের সঙ্গে বছিলা পশুর হাট নিয়ে ঝামেলা চলছে। তবে সে আবার বলেছিল যে দোয়া করতে, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
হত্যাকাণ্ডের পর থেকে নিউমার্কেট ও বছিলা এলাকায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুলিশ খুনিদের শনাক্ত করতে ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে এবং সম্ভাব্য আস্তানাগুলোতে অভিযান চালাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় কাউকেই গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।