খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে ২০২৬
বেইজিং অটো শো-এর বর্তমান চিত্রটি কেবল একটি অটোমোবাইল প্রদর্শনী নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিগত ও ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক অনন্য মঞ্চ। প্রায় ৭০টি ফুটবল মাঠের আয়তনের সমান এই বিশাল কেন্দ্রে চীন বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে তাদের উদ্ভাবনী পরাক্রম। স্মার্ট এসইউভিতে যান্ত্রিক পদ-মর্দন (Foot Massage) ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিলাসবহুল মিনিভ্যানের পরিবর্তনযোগ্য আসন বিন্যাস—সবই যেন আধুনিক প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষকে ফুটিয়ে তুলছে। শুধু তাই নয়, পেশাদার মানের কারাওকে স্পিকার বা গাড়ির হেডলাইট ব্যবহার করে দেয়ালে সিনেমা প্রদর্শনের (Projector) সুবিধা চীনা অটোমোবাইল শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সাশ্রয়ী মূল্যের গাড়িতেও এখন যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ড্রাইভিং ফিচার, যা বিশ্বজুড়ে গাড়ির কনসেপ্টকে বদলে দিচ্ছে।
বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনীতি এবং চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী। দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা বৈশ্বিক তেলসংকট চীনের দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুতায়ন পরিকল্পনার যৌক্তিকতাকে আরও জোরালো করেছে। যখন পেট্রোল বা ডিজেলচালিত গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করা সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ব্যয়সাধ্য হয়ে পড়ছে, তখন চীনের ব্যাটারিচালিত ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) বা হাইব্রিড গাড়িগুলো সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
চীনের বৃহত্তম ইভি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডির (BYD) নির্বাহী স্টেলা লির মতে, জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ববাসীর জন্য একটি ‘জাগরণী বার্তা’ (Wake-up Call)। তাঁর ভাষায়, একবার বৈদ্যুতিক গাড়ির আরাম ও সাশ্রয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেলে গ্রাহকরা আর পুরোনো জ্বালানিনির্ভর পদ্ধতিতে ফিরে যেতে চাইবেন না। রোডিয়াম গ্রুপের ২০২৫ সালের এক সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, চীনের বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির ব্যাপক প্রসারের ফলে দৈনিক তেলের চাহিদা ইতিমধ্যে এক মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি হ্রাস পেয়েছে।
চীনা প্রযুক্তির এই অভাবনীয় জোয়ারের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বেশ রক্ষণাত্মক। গত বছর ওয়াশিংটন ইভি খাতে ভর্তুকি কমিয়ে পুনরায় জ্বালানিনির্ভর অভ্যন্তরীণ জ্বলন ইঞ্জিনের (ICE) গাড়িতে প্রণোদনা বৃদ্ধি করেছে। জাতীয় নিরাপত্তা এবং স্থানীয় শিল্প সুরক্ষার অজুহাতে মার্কিন বাজারে চীনা ইভির প্রবেশাধিকার কার্যত সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।
এই উত্তপ্ত বাণিজ্যিক পরিস্থিতির মধ্যেই মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর নির্ধারিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চীনা ইভির ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক এবং গাড়িতে চীনা সফটওয়্যার ব্যবহারের ওপর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা একটি অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি করে রেখেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ জনেরও বেশি আইনপ্রণেতা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে চিঠির মাধ্যমে সতর্ক করেছেন যে, চীনা গাড়ির বাজার অবারিত করলে মার্কিন শ্রমবাজার এবং সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) ঝুঁকির মুখে পড়বে। তবে বিওয়াইডি বা জিলির মতো চীনা কোম্পানিগুলো আপাতত মার্কিন বাজারে প্রবেশের জন্য তাড়াহুড়ো করছে না। জিলির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ভিক্টর ইয়াং জানান, স্বল্প মেয়াদে তাঁদের সরাসরি মার্কিন বাজারে গাড়ি বিক্রির পরিকল্পনা না থাকলেও তাঁরা বিশ্বজুড়ে স্মার্ট প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে প্রস্তুত।
অভ্যন্তরীণ বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে মুনাফা কমে আসায় চীনা কোম্পানিগুলো এখন বিশ্ববাজারের দিকে ঝুঁকছে। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে চীনের ইভি রপ্তানি গত বছরের তুলনায় ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপের বাজারে চীনা গাড়ির ওপর শুল্ক থাকলেও, তা মূলত প্রতিযোগিতার সমতা আনার জন্য (Levelling the playing field)। ফলে সেখানে বিওয়াইডির মতো প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন প্রায় ১৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শক্তিশালী সরবরাহ শৃঙ্খল এবং স্বয়ংক্রিয় রোবোটিক কারখানার মাধ্যমে চীন যে উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করেছে, তা বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে।
একটা সময় ছিল যখন চীনের অটোমোবাইল খাত বিদেশি প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল। আজ চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। চীন এখন কেবল গাড়ি নয়, প্রযুক্তি রপ্তানি করছে। যেভাবে ফোর্ডের ‘অ্যাসেম্বলি লাইন’ একসময় মার্কিন উদ্ভাবনের প্রতীক ছিল, আজ চীনের স্বয়ংক্রিয় ইভি উৎপাদন ব্যবস্থা ঠিক তেমনি বৈশ্বিক আইকন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় চীন কেবল তেলের বিকল্প খুঁজছে না, তারা টেসলা বা ওয়েমোর মতো স্বচালিত গাড়ির (Autonomous driving) জগতেও নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে বদ্ধপরিকর। এক্সপেং, বিওয়াইডি, বাইডু, হুয়াওয়ে এবং পোনি.এআই-এর মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব সফটওয়্যার ইকোসিস্টেম তৈরি করছে। বেইজিং সরকারের লক্ষ্য স্পষ্ট—একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে তারা নেতৃত্ব দেবে এবং বিশ্ব শেষ পর্যন্ত তেলনির্ভর পুরোনো পথ ছেড়ে চীনের প্রস্তাবিত বৈদ্যুতিক ভবিষ্যৎকেই বেছে নেবে। এই বৈশ্বিক সাফল্য বেইজিংয়ের কূটনৈতিক শক্তির এক নতুন হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।