খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২ মে ২০২৬
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় সাত মাস বয়সী শিশু সন্তান মোজাহিদকে হত্যার দায়ে ১৬ দিন পলাতক থাকার পর প্রধান অভিযুক্ত পিতা মেরাজ মিয়াকে (২৮) গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-১৪)। শনিবার (২ মে, ২০২৬) দুপুরে উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের মানিকদী পূর্ব কান্দা এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। বিকেলে তাকে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
র্যাব-১৪ ভৈরব ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার শাহজাহান সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব সদস্যরা মানিকদী এলাকায় অভিযান চালিয়ে মেরাজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মেরাজ মিয়া তার সাত মাস বয়সী শিশু সন্তান মোজাহিদকে শ্বাসরোধ করে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। পরে বিকেল ৪টার দিকে তাকে ভৈরব থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
স্থানীয় সূত্র ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত মেরাজ মিয়া মানিকদী পূর্ব কান্দা এলাকার বাসিন্দা। অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন এবং এই বিষয় নিয়ে স্ত্রী তাসলিমা বেগমের সঙ্গে তাঁর প্রায়ই কলহ লেগেই থাকত। ঘটনার কয়েক দিন আগে শিশু মোজাহিদ অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার ব্যয়ভার এবং পারিবারিক তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মেরাজ ও তাসলিমার মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। পারিবারিক এই অশান্তি ও কলহের জেরেই মেরাজ তার নিজ সন্তানকে হত্যার নৃশংস পরিকল্পনা করেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্ত ও পারিবারিক অভিযোগ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ঘটনার দিন অসুস্থ শিশু মোজাহিদকে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে মেরাজ মিয়া তার নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। তবে মোজাহিদকে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই পিতা ও পুত্র উভয়েই নিখোঁজ হয়ে পড়েন। তাসলিমা বেগম সন্তানের খোঁজ নিতে চাইলে মেরাজ বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন।
একপর্যায়ে স্থানীয়দের মধ্যে এই গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, মাদকাসক্ত মেরাজ সম্ভবত তার সন্তানকে বিক্রয় করে দিয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানো হলেও তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত ১৬ এপ্রিল সকালে মানিকদী পূর্ব কান্দা এলাকার একটি বিলে স্থানীয়রা একটি অজ্ঞাত পরিচয় শিশুর মরদেহ ভাসতে দেখেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহটি উদ্ধার করলে মা তাসলিমা বেগম সেটি তার সন্তান মোজাহিদের বলে শনাক্ত করেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর শিশুটির মা তাসলিমা বেগম বাদী হয়ে স্বামী মেরাজ মিয়াকে প্রধান আসামি করে মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে ভৈরব থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা হওয়ার পর থেকেই মেরাজ মিয়া পলাতক ছিলেন। ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) লিমন বোস জানিয়েছেন, র্যাবের সহায়তায় মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মেরাজের পরিবারের অন্য সদস্যদের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মেরাজকে আদালতে সোপর্দ করে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানানো হতে পারে।
মাত্র সাত মাসের একটি দুগ্ধপোষ্য শিশুকে তার জন্মদাতা পিতার হাতে জীবন দিতে হওয়ার এই ঘটনা ভৈরব এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মাদকাসক্তির কুফল এবং পারিবারিক সচেতনতার অভাবকে এই ধরণের অপরাধের জন্য দায়ী করছেন। তাঁরা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে শিশু মোজাহিদের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। তাসলিমা বেগম তাঁর সন্তানের হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেছেন। ভৈরব থানা পুলিশ জানিয়েছে, মামলার বাকি আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে তাঁদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।