খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩ মে ২০২৬
বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানামুখী চাপে ভারতীয় মুদ্রা রুপির মানে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির বিনিময় হার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। যদিও পরবর্তীতে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়েছে, তবে ডলারের বিপরীতে রুপির বর্তমান অবস্থান ভারতীয় অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। বিশেষ করে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১২৬ ডলারে উন্নীত হওয়ায় জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে ভারতের ওপর প্রচণ্ড আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে মুদ্রা বাজারের ওপর। বৃহস্পতিবার লেনদেনের একপর্যায়ে প্রতি ডলারের বিপরীতে রুপির মান ৯৫.৩৩-এ গিয়ে ঠেকে। বর্তমানে বাজার সামান্য ঘুরে দাঁড়ালেও প্রতি ডলারের মান ৯৪ রুপির ওপরেই অবস্থান করছে।
২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত রুপির মান প্রায় ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গত বছরও মুদ্রাটির একই ধরনের অবমূল্যায়ন লক্ষ্য করা গেছে। নিচে গত কয়েক মাসের জ্বালানি তেল ও মুদ্রার বিনিময় হারের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
সারণি: জ্বালানি তেলের মূল্য ও রুপির বিনিময় হার পরিবর্তন (২০২৬)
| সময়কাল | ব্রেন্ট ক্রুড ওয়েলের দাম (ব্যারেলপ্রতি) | ডলারের বিপরীতে রুপির গড় মান |
| ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৭২ ডলার | ৮৮.৫০ (আনুমানিক) |
| মার্চ ২০২৬ | ৯০ ডলার | ৯০.২০ |
| এপ্রিল ২০২৬ | ১০৮ ডলার | ৯২.৮০ |
| বর্তমান (মে ২০২৬) | ১২৬ ডলার (সর্বোচ্চ) | ৯৪.৫০ – ৯৫.৩৩ |
রুপির এই দরপতন কেবল জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং ভারতের অভ্যন্তরীণ পুঁজিবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের (FPI) অর্থ তুলে নেওয়াও এর একটি বড় কারণ। কোটাক সিকিউরিটিজের তথ্যমতে, শুধুমাত্র এপ্রিল মাসেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতের বাজার থেকে প্রায় ৭৫০ কোটি ডলার সরিয়ে নিয়েছেন। পুরো গত অর্থবছর জুড়ে এই বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পরিমাণ ছিল ২ হাজার কোটি ডলারের বেশি।
বিদেশি বিনিয়োগ চলে যাওয়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ কমে যাচ্ছে এবং চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা রুপির মানকে ক্রমাগত দুর্বল করছে। এর আগে ডলারের বিপরীতে রুপির দরের একটি মনস্তাত্ত্বিক সীমা ছিল ৯০, যা ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে রুপির দর অচিরেই ১০০-এর ঘরে পৌঁছে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া অস্থিরতা এশীয় অঞ্চলের মুদ্রাবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যদি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১২৫ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং হরমুজ প্রণালির সংকটের কোনো কূটনৈতিক সমাধান না হয়, তবে রুপির মান ৯৬ থেকে ৯৭-এর স্তরে চলে যেতে পারে।
এই সংকট মোকাবিলায় ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (আরবিআই) বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছে:
ডলার সরবরাহ বৃদ্ধি: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করে বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ানো।
আমদানি নিয়ন্ত্রণ: ডলারের চাহিদা কমাতে স্বর্ণ ও অদরকারি পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি।
মুদ্রানীতি সংকোচন: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বৃদ্ধির মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতীয় রুপির প্রায় ৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে, যা দেশটিকে গত বছর এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রার সারিতে নিয়ে আসে। শুধু ডলার নয়, বরং ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড, জাপানি ইয়েন এবং চীনা ইউয়ানের বিপরীতেও রুপির মান ধারাবাহিকভাবে কমছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা (১৮ শতাংশে হ্রাস) আংশিক প্রশমিত হয়েছে, তবুও জ্বালানি সংকট ও মূলধন প্রবাহের ঘাটতি রুপির সুরক্ষাবলয়কে অত্যন্ত নড়বড়ে করে দিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে আরবিআই হস্তক্ষেপ করলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে না কমলে রুপির স্বাভাবিক অবস্থানে ফেরা কঠিন হবে।