খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৪ মে ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের (২৭) মরদেহ দেশে ফেরার পর তাঁর নিজ গ্রাম জামালপুরের মাদারগঞ্জে দাফন করা হয়েছে। আজ সোমবার (৪ মে ২০২৬) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উপজেলার গুনারিতলা ইউনিয়নের লালডোবা গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সোমবার বিকেল সোয়া ৩টার দিকে লিমনের মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি তাঁর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যাওয়া সন্তানের নিথর দেহ দেখে স্বজন ও প্রতিবেশীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে স্থানীয় লালডোবা উচ্চবিদ্যালয় মাঠে লিমনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন জামালপুর-৩ (মাদারগঞ্জ ও মেলান্দহ) আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল এবং মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করার মাধ্যমে শেষ বিদায় জানানো হয়।
ছেলের কফিন আঁকড়ে ধরে বাবা জহুরুল হক বিলাপ করতে করতে তাঁর বড় দুঃখের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন,
“আমি আমার ছেলেকে কোনোদিন শারীরিক কষ্ট দিইনি। কখনো একটি চড়-থাপ্পড় পর্যন্ত মারিনি, শুধু মুখেই শাসন করেছি। আমার সবচেয়ে বড় দুঃখ ও প্রশ্ন—কেন আমার ছেলেকে এত কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হলো? সে তো কারও কোনো ক্ষতি করেনি।”
ছেলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, লিমন সব সময় তাঁকে আশ্বস্ত করত যেন তিনি কোনো দুশ্চিন্তা না করেন। লিমন চাইত না তাঁর বাবা এই বয়সে চাকরি করেন। প্রয়োজনে বাবাকে ব্যবসা করার পরামর্শ দিত এবং পারিবারিক আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন দেখত। সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই লিমনের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া হলো।
জহুরুল হক আর্ন্তজাতিক পরিমণ্ডলে শিক্ষার্থী নিরাপত্তায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশে বা বিদেশে উচ্চশিক্ষারত আর কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে যেন এমন ভয়াবহ ঘটনা না ঘটে। তিনি লিমন এবং তাঁর সঙ্গে নিহত শিক্ষার্থী বৃষ্টির হত্যাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। বৃষ্টির মৃত্যুতেও তিনি শোক প্রকাশ করে তাঁকে নিজের মেয়ের সমতুল্য বলে অভিহিত করেন।
জামিল আহমেদ লিমনের পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকার বাসিন্দা। লিমনের বাবা জহুরুল হক ১৯৯৪ সালে জীবিকার তাগিদে সপরিবারে ঢাকায় চলে যান এবং একটি টেক্সটাইল কারখানায় চাকরিতে যোগ দেন। তবে শেকড়ের টানে তাঁরা নিয়মিত গ্রামের বাড়িতে যাতায়াত করতেন।
লিমনের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। তিনি ২০১৪ সালে গাজীপুরের মাওনা মডেল হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক (এসএসসি) এবং ২০১৬ সালে বীরশ্রেষ্ঠ আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষার ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তিনি স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা’তে পিএইচডি গবেষণার জন্য পাড়ি জমান। মাত্র কয়েক মাস যেতে না যেতেই বিদেশের মাটিতে এই মেধাবী তরুণকে প্রাণ দিতে হলো।
উল্লেখ্য যে, ফ্লোরিডায় লিমনের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি প্রবাসী বাংলাদেশি এবং স্থানীয় শিক্ষা মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। লিমনের পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার এই হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে লিমনের পরিবার হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে।
মাদারগঞ্জের স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। উচ্চশিক্ষারত মেধাবী সন্তানদের বিদেশের মাটিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দাবি রাখে বলে স্থানীয়রা মনে করেন। লিমনের এই অকাল প্রয়াণ কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং দেশের মেধাসম্পদের এক বিশাল অপচয় হিসেবে গণ্য হচ্ছে। শোকাহত গ্রামবাসী ও পরিবারের সদস্যরা এখন কেবল লিমনের বিদেহী আত্মার শান্তি এবং ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অপেক্ষায় রয়েছেন।