এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: বুধবার, ৬ মে ২০২৬
বীর উত্তম
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যাঁরা অমর হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বীর সেনানায়ক লে. কর্নেল কাজী নূরুজ্জামান। একজন পেশাদার সামরিক কর্মকর্তা, দূরদর্শী সংগঠক এবং আপসহীন দেশপ্রেমিক হিসেবে তিনি জাতির চেতনায় আজও উজ্জ্বল।
১৯২৫ সালের ২৪ মার্চ যশোরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শিক্ষাজীবনে ছিলেন মেধাবী ও প্রতিভাবান—কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে অধ্যয়নকালে দেশপ্রেমের টানে যোগ দেন রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মা ও সুমাত্রা ফ্রন্টে মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধ করেন।
দেশভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকলেও, বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ়। ১৯৬৯ সালে নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন—যা তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তা ও ন্যায়বোধের পরিচয় বহন করে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা শুরু হলে তিনি আর নিরব থাকেননি। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে ৭নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা ও দিনাজপুর অঞ্চলে সংগঠিত হয় দুর্ধর্ষ প্রতিরোধ—যা শত্রুবাহিনীকে দুর্বল করে এবং স্বাধীনতার পথকে ত্বরান্বিত করে।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সক্রিয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন, প্রগতিশীল রাজনীতি, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা—সবক্ষেত্রেই তাঁর কণ্ঠ ছিল দৃঢ় ও আপসহীন। জাহানারা ইমাম–এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনেও তিনি ছিলেন অগ্রসেনানী।
তিনি ছিলেন লেখক, চিন্তাবিদ এবং সংগঠক। ‘স্বদেশ চিন্তা’, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনীতি’সহ তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহে উঠে এসেছে ইতিহাস, সংগ্রাম ও জাতির ভবিষ্যৎ ভাবনা।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সংস্কৃতিমনা ও প্রজ্ঞাবান। তাঁর পরিবারও দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে—যা তাঁর আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার চিরস্থায়ী স্বীকৃতি।
২০১১ সালের ৬ মে ঢাকায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর সংগ্রাম এবং তাঁর স্বপ্ন—বাংলাদেশের হৃদয়ে চিরজাগরুক।
শ্রদ্ধাঞ্জলি এই মহান বীর সেনানায়ককে—
যাঁর জীবন আমাদের পথ দেখায়, সাহস জোগায়, আর দেশপ্রেমের নতুন অর্থ শেখায়।