খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৬ মে ২০২৬
রাজশাহীতে যৌতুকের দাবি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসিনা খাতুন (২১) নামের এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (৫ মে, ২০২৬) দিবাগত রাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অভিযোগ উঠেছে, হাসিনা মারা যাওয়ার পর মানবিকতা বিসর্জন দিয়ে স্বামী মো. রাতুল ও তার সহযোগীরা মৃতদেহের শরীর থেকে স্বর্ণালংকার খুলে নিয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির সকল সদস্য পলাতক রয়েছেন।
নিহত হাসিনা খাতুন নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার আন্দারদিঘি গ্রামের হাসান আলীর কন্যা। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাত মাস আগে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ি মোল্লাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রাতুলের সঙ্গে হাসিনার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় সুখের স্বপ্ন দেখলেও কয়েক মাসের মধ্যেই দাম্পত্য জীবনে কলহ শুরু হয়। হাসিনা দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন বলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন।
হাসিনার পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই স্বামী রাতুল যৌতুকের জন্য হাসিনার ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। বিশেষ করে বাবার বাড়ি থেকে ১ লক্ষ টাকা এনে দেওয়ার জন্য হাসিনাকে প্রায়ই মারধর করা হতো। রাতুল নিজে মাদক সেবনের পাশাপাশি মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই যৌতুকের টাকা দিয়ে তিনি বড় পরিসরে ফেনসিডিলের ব্যবসা করার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে নিহতের স্বজনরা জানান।
নিরন্তর নির্যাতন ও যৌতুকের চাপ সহ্য করতে না পেরে গত সোমবার দিবাগত রাতে হাসিনা খাতুন বিষপান (কীটনাশক) করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে তাকে প্রথমে গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকাবস্থায় মঙ্গলবার দিবাগত রাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
হাসিনার খালাতো ভাই রবিউল ইসলাম অভিযোগ করেন, হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন রাতুল, তার দুই বন্ধু এবং হাসিনার বোন লাইলা খাতুন উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু হাসিনা মারা যাওয়ার সংবাদের পরপরই রাতুল ও তার সঙ্গীরা কান্নাকাটি বা আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পরিবর্তে এক বীভৎস কাণ্ড ঘটান। তারা মৃত হাসিনার কান ও গলায় থাকা স্বর্ণালংকারগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সাথে খুলে নেন এবং মরদেহ হাসপাতালের ওয়ার্ডে ফেলে রেখেই গা-ঢাকা দেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর বুধবার (৬ মে) নিহতের বোন মেহেরুন্নেসা বাদী হয়ে গোদাগাড়ী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে জানান, অভিযোগের প্রেক্ষিতে আত্মহত্যায় প্ররোচনা প্রদানের দায়ে একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা পলাতক রয়েছেন এবং তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান শুরু হয়েছে।
ওসি আতিকুর রহমান আরও জানান, “হাসিনার মরদেহ বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হবে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং শরীরের আঘাতের চিহ্ন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে। এরপর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।”
হাসিনার অকাল মৃত্যুতে তার পৈত্রিক গ্রাম নওগাঁর আন্দারদিঘিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ। যৌতুক ও মাদকের ভয়াবহতা কীভাবে একটি তরুণী ও তার গর্ভস্থ সন্তানের প্রাণ কেড়ে নিলো, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত রাতুল পেশাদার মাদক কারবারি হওয়ায় তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশের কঠোর ভূমিকার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কীটনাশক পানের পর হাসপাতালে আনার ক্ষেত্রে বিলম্ব হওয়ায় এবং বিষক্রিয়া রক্তে ছড়িয়ে পড়ায় হাসিনাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তবে মৃত্যুর পর একজন স্বামীর এমন আচরণ—মরদেহের গয়না খুলে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া—চিকিৎসক ও নার্সদের মধ্যেও বিস্ময় ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে পুলিশ রাতুলের অবস্থান শনাক্ত করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিযান পরিচালনা করছে। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় এনে আরও কঠোর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন হাসিনার পরিবার।