খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
২০১৬ সালের ২৬ মে লালমনিরহাট পৌরসভা এলাকায় একটি মর্মান্তিক ও নৃশংস ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ঘটনার দিন বিকেলে লালমনিরহাট পৌরসভার পূর্ব সাপ্টানা মাঝাপাড়া এলাকার বাসিন্দা কামিনী কান্ত বর্ম্মনের ছেলে অনাথ চন্দ্র বর্ম্মন (৪২) তার প্রতিবেশী এক স্কুলছাত্রীকে বাড়িতে একা পেয়ে আক্রমণ করে। ভুক্তভোগী শিশুটি স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।
ঘটনার সময় শিশুটির বাড়িতে অন্য কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। এই সুযোগে অভিযুক্ত অনাথ চন্দ্র বর্ম্মন ঘরে প্রবেশ করে ভুক্তভোগীর মুখ বেঁধে জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে। ঘটনার পর শিশুটির বাবা-মা বাড়িতে ফিরে এসে উঠানের মধ্যে তাদের সন্তানকে রক্তাক্ত এবং গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।
আহত শিশুটিকে উদ্ধার করে প্রথমে দ্রুত লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
ঘটনার দিনই, অর্থাৎ ২০১৬ সালের ২৬ মে, ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা বাদী হয়ে লালমনিরহাট সদর থানায় অনাথ চন্দ্র বর্ম্মনকে একমাত্র আসামি করে একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর পুলিশ তৎপরতা শুরু করে এবং ঘটনার মাত্র কয়েকদিনের মাথায়, ৩ জুন ২০১৬ তারিখে অভিযুক্ত অনাথ চন্দ্র বর্ম্মনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। গ্রেপ্তারের পর পুলিশ তাকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করে।
লালমনিরহাট সদর থানা পুলিশ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে দ্রুততার সাথে কাজ করে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ভুক্তভোগীর জবানবন্দি, চিকিৎসকের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেন। তদন্ত প্রক্রিয়া শেষে ঘটনার তিন মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ২০১৬ সালের ২৯ আগস্ট, তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামি অনাথ চন্দ্র বর্ম্মনের বিরুদ্ধে আদালতে সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। বিজ্ঞ আদালত অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়ে আসামির বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ প্রদান করেন।
দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে চলা বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে সোমবার, ১৮ মে (২০২৬ সাল), লালমনিরহাট শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারক (দায়রা জজ) নিত্যানন্দ সরকার জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় পড়ে শোনান। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি অনাথ চন্দ্র বর্ম্মন আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
বিজ্ঞ আদালত আসামির বিরুদ্ধে আনীত অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। একই সাথে আদালত তাকে ১০ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা করেন। এই জরিমানার অর্থ অনাদায়ে তাকে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া, বিচারক তার রায়ে আরও স্পষ্ট করেন যে, আসামি বিচার চলাকালীন সময়ে বা পূর্বে যতটুকু সময় হাজতবাস করেছেন, সেই হাজতবাসের মেয়াদকাল তার মূল সাজা অর্থাৎ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে বাদ দেওয়া হবে।
আদালতের রায় ঘোষণা এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি অনাথ চন্দ্র বর্ম্মনকে কড়া পুলিশি পাহারায় লালমনিরহাট জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। লালমনিরহাট আদালত পুলিশের পরিদর্শক আমিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আদালতের আদেশ অনুযায়ী আসামিকে সাজা পরোয়ানা মূলে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রায়ের পর ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রীর পরিবার গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ন্যায়বিচার পাওয়ায় তারা আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।