খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রচলিত কূটনৈতিক রীতি ও নীতিগত অবস্থান ভেঙে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের সাথে সরাসরি কথা বলার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে। ১৯৭৯ সালে ওয়াশিংটন বেইজিং সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এবং তাইওয়ানের সাথে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পর থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সিটিং বা ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট তাইওয়ানের কোনো নেতার সাথে সরাসরি যোগাযোগ বা কথা বলেননি। ফলে ট্রাম্পের এই ঘোষণা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় ধরনের ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তাইওয়ানকে চীন নিজেদের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে দ্বীপটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সম্ভাবনাও বেইজিং কখনো নাকচ করেনি। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৭৯ সালে মার্কিন কংগ্রেসে ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’ (Taiwan Relations Act) পাস হয়। এই আইন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহ করতে বাধ্য। এই আইনি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই ওয়াশিংটন দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তাইওয়ানের কাছে ধারাবাহিকভবে অস্ত্র বিক্রি করে আসছে। তবে একই সাথে বেইজিংয়ের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে সবসময় একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়।
সম্প্রতি বেইজিংয়ে দুই দিনব্যাপী দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলন শেষ করে এয়ারফোর্স ওয়ানে ফেরার পথে এবং পরবর্তীতে ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলার এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন, “আমি তাঁর সাথে কথা বলব। আমি সবার সাথেই কথা বলি… আমরা তাইওয়ান সমস্যাটি নিয়ে কাজ করব।” একই সাথে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সাথে নিজের সম্পর্ককে ‘অসাধারণ’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। ট্রাম্প আরও জানান যে, বর্তমানে তাইওয়ান যিনি চালাচ্ছেন, অস্ত্র বিক্রির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে তাঁর সাথে কথা বলা প্রয়োজন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বর্তমানে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি (১৪ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের একটি সম্ভাব্য অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রশাসনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই প্রস্তাবিত অস্ত্র চুক্তির আওতায় ড্রোন-বিধ্বংসী সরঞ্জাম এবং বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর তাইওয়ানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে দ্বীপটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্যোগ নিয়েছেন।
এই অস্ত্র চুক্তিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন, বেইজিং এবং তাইপেইয়ের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। নিচে চলমান এই অস্ত্র চুক্তি ও সংশ্লিষ্ট ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | সংশ্লিষ্ট তথ্য ও বর্তমান স্থিতি |
| প্রস্তাবিত অস্ত্র চুক্তির আর্থিক মূল্য | প্রায় ১,৪০০ কোটি (১৪ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। |
| অস্ত্রের ধরন ও সরঞ্জাম | ড্রোন-বিধ্বংসী সরঞ্জাম এবং বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। |
| পূর্ববর্তী অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন | গত বছরের ডিসেম্বরে ১,১০০ কোটি (১১ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয় যুক্তরাষ্ট্র। |
| পেন্টাগন কর্মকর্তার সফর জটিলতা | মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবির প্রস্তাবিত চীন সফর বেইজিং সাময়িকভাবে আটকে দিয়েছে। |
| চীনের শর্ত | মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অস্ত্রচুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত কী সিদ্ধান্ত নেন, তা পর্যালোচনার পূর্বে চীন এই সফরের অনুমোদন দেবে না। |
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের সময় চীনা কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে, মার্কিন-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো তাইওয়ান। চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছিলেন যে, এই বিষয়টি সঠিকভাবে সামলানো না গেলে দুই পরাশক্তির মধ্যে সরাসরি ‘সংঘাত’ তৈরি হতে পারে। যদিও ট্রাম্প তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন, তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে সি চিন পিং এই ইস্যুতে ‘খুবই কঠোর’ অবস্থানে আছেন। এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, “আমি কোনো পক্ষকেই কোনো প্রতিশ্রুতি দিইনি।”
ট্রাম্প এবং সি চিন পিংয়ের মধ্যকার এই বৈঠকের পর তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তাঁর দেশের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন, তাইওয়ান একটি “সার্বভৌম, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশ” এবং তাইওয়ান প্রণালির শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে কোনো কিছুর বিনিময়ে “উৎসর্গ বা লেনদেন” করা হবে না। লাই চিং–তে আরও জোর দিয়ে বলেন যে, মার্কিন অস্ত্র বিক্রি এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অন্যতম মূল চাবিকাঠি। চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপ মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট লাইয়ের অধীনে তাইওয়ান তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য মার্কিন কূটনৈতিক রীতি ভাঙার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি তাইওয়ানের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েনের সাথে টেলিফোনে কথা বলেছিলেন। সেই সময় এই ঘটনার প্রেক্ষিতে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
এ ছাড়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সাথে এই অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি নিয়ে “বিস্তারিত আলোচনা” করেছেন। ট্রাম্পের এই দাবি যদি সত্য হয়, তবে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার বড় লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। কারণ, ১৯৮২ সালের একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে (যা ‘ছয়টি আশ্বাস’ বা Six Assurances নামে পরিচিত) যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে আশ্বস্ত করেছিল যে, তারা তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে বেইজিংয়ের সাথে কোনো পূর্ব পরামর্শ বা আলোচনা করবে না। বেইজিং থেকে ফেরার পথে এই প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সংক্ষেপে বলেন, “এটা তো অনেক আগের কথা।”
বর্তমানে তাইওয়ানের অধিকাংশ নাগরিক নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করলেও, তারা মূলত বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার পক্ষে। এর অর্থ হলো, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন করে স্বাধীনতার ঘোষণাও দিতে চায় না, আবার গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের সাথে একীভূত হতেও সম্মত নয়। এই ত্রিভুজমুখী কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সাথে সরাসরি কথা বলার এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।