এস এম কামরুজ্জামান সাগর
প্রকাশ: সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
বাঙালি জাতিসত্তা, সাম্য, মানবতা এবং দ্রোহচেতনার অন্যতম প্রধান প্রতীক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান শুধু সাহিত্যিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাঙালির রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাঁর রচিত কবিতা, গান ও প্রবন্ধ যুগে যুগে বাঙালিকে সংগ্রাম, অধিকারচেতনা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। কবির জীবন-ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান-এর এক ঐতিহাসিক উদ্যোগের সঙ্গে, যার মাধ্যমে স্বাধীনতার পর বিদ্রোহী কবিকে বাংলাদেশে সসম্মানে নিয়ে আসা হয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির যে ধারা বাঙালির মুক্তির সংগ্রামকে অনুপ্রাণিত করেছে, স্বাধীন বাংলাদেশে সেই চেতনাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭২ সালে কবির ৭৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু তাঁকে ঢাকায় আনার জন্য একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সে সময় কবি ভারতের কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর তৎকালীন পূর্তমন্ত্রী মতিউর রহমান এবং আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবা সম্পাদক মুস্তফা সারওয়ার-কে ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসেবে কলকাতায় পাঠান।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে কবির কাছে একটি আন্তরিক আমন্ত্রণপত্রও পাঠানো হয়। সেই চিঠিতে স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে কবিকে দেশে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়। বঙ্গবন্ধু তাঁর বার্তায় উল্লেখ করেন যে, স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের জনগণ কবির আগমনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং তাঁর আদর্শে নতুন বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করতে চায়। চিঠির শেষে তিনি “জয় বাংলা” স্লোগানও উল্লেখ করেন, যা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান প্রেরণার প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
বঙ্গবন্ধুর এই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ১৯৭২ সালের ২৪ মে কাজী নজরুল ইসলামকে কলকাতা থেকে সসম্মানে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানীতে কবির আগমন ছিল দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ঢাকায় পৌঁছানোর পর তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে এ বিষয়ে সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
কবি নজরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তৎকালীন সরকার কবির জন্য রাজধানীর ধানমন্ডিতে একটি বাড়ি বরাদ্দ করে। একই সঙ্গে তাঁর চিকিৎসা, দেখভাল এবং জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় দায়িত্বও রাষ্ট্র গ্রহণ করে। সে সময় কবি শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বাকশক্তি হারিয়ে নীরব জীবনযাপন করছিলেন। তারপরও তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়।
নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার সিদ্ধান্তকে শুধু একজন কবির পুনর্বাসন হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাম্যের দর্শন এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে নজরুলকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মর্যাদা দেওয়ার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দর্শনও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট কাজী নজরুল ইসলাম মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশেই অবস্থান করেন এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জীবন অতিবাহিত করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ-এর পাশে সমাহিত করা হয়। আজও তাঁর সমাধিস্থল দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী, সাহিত্যপ্রেমী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর রচিত বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির বাণী বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
লেখকঃনির্মাতা, সংগঠক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট।