খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যখন দুই দেশের কূটনীতিকরা একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছানোর জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, ঠিক তখনই তেহরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছে ওয়াশিংটন। কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব না হলে ইরানে আবারও সামরিক হামলা শুরু করতে যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী (পেন্টাগন প্রধান) পিট হেগসেথ।
শনিবার (৩০ মে) সিঙ্গাপুরে আয়োজিত এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা সম্মেলন ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’-এ অংশ নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই মন্তব্য করেন। সম্মেলনে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, প্রয়োজনে ইরানে আবারও সামরিক অভিযান শুরু করার মতো পূর্ণ সক্ষমতা ওয়াশিংটনের রয়েছে।
শাংরি-লা ডায়ালগে দেওয়া বক্তব্যে পিট হেগসেথ যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক শক্তি ও অস্ত্রের মজুদের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, কেবল মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য মার্কিন অস্ত্রের মজুদ সম্পূর্ণ উপযুক্ত এবং এ ক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
একই সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন যে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এশিয়া-প্যাসিফিক বা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে নিজেদের মনোযোগ সরিয়ে নেয়নি। মার্কিন প্রশাসন একই সঙ্গে দুটি অঞ্চলের সামরিক ও কৌশলগত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম। পেন্টাগন বর্তমানে তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করছে, যার ফলে খুব শীঘ্রই গোলাবারুদ উৎপাদন আগের চেয়ে দ্বিগুণ, তিনগুণ বা চারগুণ বৃদ্ধি পাবে। এই বর্ধিত উৎপাদন সক্ষমতা বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত সামরিক পরিকল্পনাগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পেন্টাগন প্রধানের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান সংকটের ক্ষেত্রে বেশ ‘ধৈর্য’ দেখাচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট এমন একটি ‘চমৎকার চুক্তি’ করতে চান, যা নিশ্চিত করবে যে ইরান ভবিষ্যতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না।
এই হুঁশিয়ারির আগের দিন, শুক্রবার (২৯ মে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে, ইরান যুদ্ধ অবসানের একটি প্রস্তাবের বিষয়ে ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ নিতে তিনি হোয়াইট হাউসের একটি নিরাপদ কক্ষে (সিচুয়েশন রুম) বৈঠকে বসবেন। প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনার আওতায় গত এপ্রিলের শুরুতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এই অতিরিক্ত সময় দুই দেশের কূটনীতিকদের একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক।
চলমান এই সংঘাতের প্রভাব কেবল দুই দেশের সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। যুদ্ধের কারণে ইরান কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বৃদ্ধি পেয়েছে।
নিচে চলমান সংঘাত ও এর সময়কাল সম্পর্কিত মূল তথ্যগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেওয়া হলো:
| ঘটনার বিবরণ | সংশ্লিষ্ট তারিখ ও তথ্য |
| যুদ্ধ শুরুর তারিখ | ২৮ ফেব্রুয়ারি |
| আক্রমণকারী পক্ষ | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী |
| প্রথম যুদ্ধবিরতি কার্যকর | এপ্রিলের শুরুতে |
| প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধি | আরও ৬০ দিন |
| সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক | ইরান ও লেবানন |
| অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণ | হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি |
কূটনৈতিক পর্যায়ে শান্তি আলোচনার পাশাপাশি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই হুঁশিয়ারি বার্তা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে নতুন একটি মাত্রায় নিয়ে গেছে। পেন্টাগন একদিকে যেমন দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের পথ খোলা রাখছে, ঠিক অন্যদিকে চুক্তি ব্যর্থ হলে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতিও বজায় রাখছে।