খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন ২০২৬
হংকং এবং সিঙ্গাপুরসহ এশিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে গড় আয়ু ও জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ভবিষ্যৎ এবং অবসরকালীন জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দিন দিন তীব্র হচ্ছে। তবে উদ্বেগের মাত্রা বাড়লেও সেই তুলনায় বাস্তবমুখী আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে এক ধরনের উদাসীনতা ও স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক ও বীমা বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এশিয়ার বীমা কোম্পানিগুলোকে এখন শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রথাগত প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বরং তাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত গ্রাহকদের এই মানসিক ও আর্থিক উদ্বেগকে বাস্তবমুখী পরিকল্পনায় রূপান্তর করা এবং অবসরকালীন সঞ্চয়ের প্রতি তাদের কার্যকরভাবে উদ্বুদ্ধ করা।
এফডব্লিউডি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি (বারমুডা) লিমিটেড কর্তৃক পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক জরিপে হংকং এবং ম্যাকাও অঞ্চলের নাগরিকদের আর্থিক অসচ্ছলতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কার একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী হংকং ও ম্যাকাও-এর প্রায় ৬৪ শতাংশ বাসিন্দা সরাসরি জানিয়েছেন যে, তারা বর্তমানে তীব্র মানসিক চাপে আছেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত অথবা অত্যন্ত সাধারণ উপায়ে কোনোমতে তাদের জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছেন। ১,০০০ জনেরও বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত এই জরিপ থেকে আরও জানা যায়, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান আর্থিক উদ্বেগের কারণগুলোর শীর্ষে রয়েছে অনবরত বৃদ্ধি পেতে থাকা নিত্যপ্রয়োজনীয় জীবনযাত্রার ব্যয়, চিকিৎসা খাতের ক্রমবর্ধমান খরচ এবং অবসর জীবনের জন্য পর্যাপ্ত সঞ্চয়ের চরম অভাব।
এফডব্লিউডি-এর হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বৃহত্তর চীন অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেন লাউ এই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জানান, জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ক্রমাগত সচেতনতা বৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে হংকং টানা ১০ বছর ধরে বিশ্বের দীর্ঘতম গড় আয়ুর অঞ্চল হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছে। তবে গড় আয়ু বৃদ্ধির এই ইতিবাচক দিকটি এখন অবসর জীবনযাপনের ক্ষেত্রে নতুন এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ মানুষ যত বেশি দিন বাঁচবে, তার সঞ্চিত অর্থ অবসরের আগেই শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ততটাই বৃদ্ধি পাবে। ফলে আর্থিক সচেতনতা থাকা সত্ত্বেও বাস্তব ক্ষেত্রে অবসরের প্রস্তুতি না নেওয়ার এই ব্যবধান দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে।
একই ধরনের চিত্র লক্ষ্য করা গেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র সিঙ্গাপুরেও। সিআইএমবি ব্যাংক বেরহাদ কর্তৃক সিঙ্গাপুরে পরিচালিত একটি পৃথক গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে যে, সেখানকার প্রায় ৭৮ শতাংশ বাসিন্দা মনে করেন আর্থিক স্বাধীনতা বা আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করা সম্পূর্ণ সম্ভব। তবে এই ইতিবাচক ধারণার পাশাপাশি প্রায় ৩৪.৬ শতাংশ নাগরিক তাদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও সংশয় প্রকাশ করেছেন।
সিঙ্গাপুরের বাসিন্দাদের অবসরকালীন দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও পরিকল্পনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় বা বাধা হিসেবে কাজ করছে বর্তমান বাজারের উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পরিবারের প্রতি সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্বের চাপ। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের অর্ধেকেরও কম বাসিন্দা তাদের অবসর জীবনের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পরিকল্পনা শুরু করতে পেরেছেন। নানয়াং বিজনেস স্কুলের ডেপুটি ডিন শ্যারন এনজি এই গবেষণা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে মন্তব্য করেছেন যে, সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের কাছে আর্থিক স্বাধীনতার সংজ্ঞা এখন আর কেবল ব্যাংকে গচ্ছিত কোনো নির্দিষ্ট অঙ্কের আর্থিক সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং যেকোনো ধরনের আর্থিক মানসিক চাপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকাই এখন তাদের কাছে প্রকৃত আর্থিক স্বাধীনতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
হংকংয়ের জরিপে অংশগ্রহণকারী বাসিন্দারা ধারণা করেছেন যে, অবসর জীবনের খরচ মেটানোর জন্য তাদের প্রত্যেকের গড়ে প্রায় ৮,১৭,০০০ মার্কিন ডলার (যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ৬.৪ মিলিয়ন হংকং ডলার) সঞ্চয়ের প্রয়োজন হবে। কিন্তু একই সাথে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই বিশাল পরিমাণ সঞ্চিত তহবিল তাদের বড়জোর ৮২ বছর বয়স পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। অথচ বর্তমানে হংকংয়ের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৮৬ বছরে পৌঁছেছে। এর ফলে নাগরিকদের গড় আয়ু এবং সম্ভাব্য সঞ্চয়ের স্থায়িত্বের মধ্যে স্পষ্ট ৪ বছরের একটি বড় আর্থিক ঘাটতি বা ফাণ্ডিং গ্যাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অবসর জীবনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাসীনতা ও ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে মূলত বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। হংকংয়ের ‘জেনারেশন জেড’ বা জেন-জেড প্রজন্মের তরুণরা অন্যান্য বয়সীদের তুলনায় সবচেয়ে দ্রুত বা কম বয়সে কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে এবং তাদের অবসরকালীন সঞ্চয়ের চাহিদার প্রাক্কলনও ছিল সবচেয়ে বেশি। অথচ আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, এই তরুণদের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ নিশ্চিত করেছেন যে তারা তাদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বর্তমানে সক্রিয়ভাবে কোনো বাস্তবমুখী পদক্ষেপ বা সঞ্চয় করছেন। সামগ্রিক জরিপে দেখা গেছে, সব বয়সী উত্তরদাতার মধ্যে ৪৩ শতাংশ মানুষ আর্থিক বিষয় নিয়ে কখনোই কোনো পেশাদার আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেননি এবং ৩০ শতাংশ মানুষ অবসরকালীন তহবিলে নিয়মিতভাবে কোনো অর্থ জমা বা অবদান রাখেন না।
এফডব্লিউডি হংকং ও ম্যাকাও-এর চিফ প্রপোজিশন অ্যান্ড হেলথকেয়ার অফিসার কেলভিন ইউ বর্তমান স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রীক আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রসারের ফলে চিকিৎসার সামগ্রিক ব্যয় আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা খরচ বর্তমান সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার ওপর অতিরিক্ত মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
এফডব্লিউডি-এর জরিপে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে যে, হংকংয়ের তথাকথিত “স্যান্ডউইচ জেনারেশন” (যারা একই সাথে তাদের সন্তান এবং বৃদ্ধ বাবা-মা উভয়েরই ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করছেন) এর প্রায় ৬৪ শতাংশ মানুষ এখনো জানেন না যে বাজারে এমন বীমা পণ্য বা পলিসি রয়েছে যা একক পরিকল্পনার অধীনে পরিবারের একাধিক সদস্যকে একসাথে নিরাপত্তা প্রদান করে। এই তথ্যটি নির্দেশ করে যে, বীমা কোম্পানিগুলোর বর্তমান সমস্যা কেবল নতুন পলিসি বা পণ্য তৈরির অভাব নয়, বরং সাধারণ গ্রাহকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিপণন, প্রচার ও যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একটি বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।