খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন ও রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য সম্পন্ন করার লক্ষ্যে তিন দিনব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, রাজধানী তেহরানসহ দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে এই রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানসমূহ অনুষ্ঠিত হবে। এই ঐতিহাসিক ও মেগা আয়োজনে সামগ্রিকভাবে প্রায় দুই কোটি মানুষের বিশাল সমাগম ও অংশগ্রহণ হতে পারে বলে দেশটির নীতিনির্ধারক মহল থেকে ধারণা করা হচ্ছে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে।
ইসলামি শরিয়ত ও ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সাধারণত কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই দাফনকার্য সম্পন্ন করার নিয়ম রয়েছে। তবে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ক্ষেত্রে এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম দিনে নিজ সরকারি বাসভবনে এক আকস্মিক ও ভয়াবহ হামলায় নিহত হন খামেনি। তার মৃত্যুর পর উদ্ভূত পরিস্থিতি ও নিরাপত্তার স্বার্থে খামেনির জানাজা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছিল।
সে সময় ইরানের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল জানিয়েছিল যে, জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের সম্ভাব্য উপস্থিতি এবং এই বিশাল জনসমুদ্র সামাল দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক প্রস্তুতির ঘাটতি থাকার কারণেই মূলত অনুষ্ঠান আয়োজন সাময়িকভাবে বিলম্বিত করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর অবশেষে সেই স্থগিত থাকা শেষকৃত্যের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ঘোষণা করল ইরান সরকার।
আজ মঙ্গলবার (২ জুন, ২০২৬) রাজধানী তেহরানের উপ-মেয়র মোহাম্মদ আমিন তাভাকোলি-জাদেহ এই রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ঘোষিত তিন দিনের এই রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির মধ্যে শুধু রাজধানী তেহরানই নয়, বরং দেশটির অন্যতম প্রধান দুটি ধর্মীয় নগরী কোম এবং মাশহাদেও বিশাল শোকযাত্রা ও বিশাল জনসমাগমের বিশেষ আয়োজন থাকবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি-এর (IRIB) দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে উপ-মেয়র আরও উল্লেখ করেন যে, রাজধানী তেহরানে শেষকৃত্যের মূল আনুষ্ঠানিকতা ও মূল পর্বটি বিরতিহীনভাবে অন্তত ২৪ ঘণ্টা ধরে চলমান থাকবে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে আসা প্রায় দুই কোটি মানুষের বিশাল অংশগ্রহণের সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসন তাদের সার্বিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
অন্য দিকে, ইরানের অপর প্রধান রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ (IRNA) খামেনির দাফন প্রক্রিয়া নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি জুন মাসের মাঝামাঝি বা শেষভাগে যেকোনো সময়ে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনকার্য চূড়ান্তভাবে অনুষ্ঠিত হবে।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে খামেনির দাফনের সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ বা বার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি, তবে সরকারি ও কূটনৈতিক বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রবলভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে, আগামী ২১ জুন ২০২৬ তারিখে এই মেগা অনুষ্ঠানের মূল আয়োজন সম্পন্ন হতে পারে। সেই দিনটিকে কেন্দ্র করেই কোমর বেঁধে নামছে তেহরান পৌরসভা ও ইরানের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শেষকৃত্যের মূল রূপরেখা: তেহরান, কোম এবং মাশহাদ—এই তিন শহরে তিন দিনব্যাপী শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে এবং তেহরানের মূল অনুষ্ঠানটি টানা ২৪ ঘণ্টা ধরে চলবে।
মৃত্যুকালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। তিনি দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত শক্ত হাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বা সুপ্রিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশটির ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে তার এই আকস্মিক ও নাটকীয় মৃত্যুর পর সমগ্র ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। খামেনির মৃত্যুর পর তেহরানের রাস্তায় একদিকে যেমন গভীর শোক, ক্ষোভ ও চরম বিস্ময়ের আবহ তৈরি হয়েছিল, ঠিক অন্য দিকে তেমনি কিছু অংশের মানুষের মাঝে উদ্যাপনের এক নজিরবিহীন ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া প্রত্যক্ষ করা যায়।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্ধারণের জন্য দেশটির বিশেষজ্ঞ পরিষদ বা ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ জরুরি বৈঠকে বসে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা ও উত্তরসূরি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে। তবে ইরানের এই ক্রান্তিকালে ও অত্যন্ত সংবেদনশীল যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে আজ পর্যন্ত আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি কোনো কারণে এখনো জনসমক্ষে বা কোনো রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের সামনে সরাসরি উপস্থিত হননি। তার এই অনুপস্থিতির মধ্যেই পিতার শেষকৃত্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্পন্ন করার এই বিশাল মহাযজ্ঞ শুরু হতে যাচ্ছে।