খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
রাজধানীর মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আলোড়ন তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওর ভিত্তিতে অভিযোগ উঠেছিল যে, এই নারী তাঁর উচ্চশিক্ষিত সন্তানদের চরম অবহেলা ও ভরণপোষণহীনতার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে মরদেহ ময়নাতদন্তের প্রাথমিক ফলাফল এবং বিস্তারিত অনুসন্ধানে এই মৃত্যুর সময় ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে প্রচলিত কয়েকটি দাবির সঙ্গে বাস্তব তথ্যের ভিন্নতা পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের বরাত দিয়ে প্রথমে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয় যে, মরদেহ উদ্ধারের অন্তত এক সপ্তাহ আগে নূর জাহান বেগম মারা যান এবং মরদেহটিতে পচন ধরেছিল। তবে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ময়নাতদন্ত সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য এবং অনুসন্ধানে এই দাবির কোনো সত্যতা মেলেনি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় মরদেহের পিঠের ক্ষতটি পচন নয়, বরং দীর্ঘ সময় শুয়ে থাকার কারণে সৃষ্ট শয্যাক্ষত। প্রকৃত ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাবির একটি তুলনামূলক বিবরণ নিচে উপস্থাপন করা হলো:
| অনুসন্ধানের মূল বিষয় | প্রাথমিক অভিযোগ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দাবি | ময়নাতদন্ত ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রকৃত তথ্য |
| মৃত্যুর সময়কাল | মরদেহ উদ্ধারের অন্তত এক সপ্তাহ (৭ দিন) আগে মৃত্যু হয়েছে এবং শরীরে পচন ধরেছে। | মর্গে আনার পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে। অনেক দিন আগে মৃত্যুর কারণে শরীরে পচন ধরার কোনো সত্যতা নেই। |
| শরীরের ক্ষত | মরদেহে পচন ধরেছে এবং পোকার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে বলে অভিযোগ। | পিঠের ক্ষতটি মূলত ‘বেডসোর’ বা ‘শয্যাক্ষত’। দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে শুয়ে থাকার ফলে শরীরের অংশে অতিরিক্ত চাপে এই ক্ষত তৈরি হয়েছে। |
| ভরণপোষণ ও অবহেলা | সন্তানরা মাকে পরিত্যাগ করেছিলেন এবং কোনো ভরণপোষণ দিতেন না। | তিনি জীবনের শেষ দুই বছর মিরপুরের ফ্ল্যাটে তাঁর মেয়ের সঙ্গেই বাস করছিলেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে তিনি তাঁর দুই ছেলের কাছেও ছিলেন। |
| মরদেহ উদ্ধার ও দাফন | মৃত্যুর বেশ কয়েকদিন পর দুর্গন্ধ ছড়ালে পুলিশকে খবর দিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। | ৩১ মে (মৃত্যুর দিনই) পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়। পরদিন ১ জুন চাঁদপুরের উত্তর উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। |
নূর জাহান বেগমের সন্তানরা সমাজে অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত পদে কর্মরত। এই মৃত্যুর ঘটনা এবং অবহেলার অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরকারি পর্যায়ে এবং আইনগতভাবে কিছু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। গত ৩ জুন (বুধবার) সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী এই বৃদ্ধার সন্তানদের উদ্দেশ্যে একটি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর বড় ছেলের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রয়াত নূর জাহান বেগমের সন্তানদের পরিচিতি ও বর্তমান অবস্থান:
১. এ কে এম আনিসুর রহমান (বড় ছেলে): তিনি সরকারের একজন যুগ্ম সচিব এবং মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। এই ঘটনার জের ধরে তাঁকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তিনি গ্রামের বাড়িতে উপস্থিত থেকে মায়ের দাফন প্রক্রিয়া তদারক করেন।
২. ড. এ কে এম আশিকুর রহমান (ছোট ছেলে): তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের একজন অধ্যাপক। সন্তানদের দাবি অনুযায়ী, মায়ের মৃত্যুর দুই দিন আগে ঈদের দিন তিনি ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে মাকে কোরবানির মাংস খাইয়ে এসেছিলেন।
৩. ফাতিমা নাসরীন সুলতানা (মেয়ে): তিনি মিরপুরের একটি স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক। মিরপুরের যে ফ্ল্যাট থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি তাঁরই মালিকানাধীন এবং মা বিগত দুই বছর যাবত তাঁর সঙ্গেই অবস্থান করছিলেন।
গত ৩১ মে মিরপুরের সেকশন ৬, ব্লক সি, ১৩ নম্বর সড়কের একটি ভবনের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিডিও অনুযায়ী, ফ্ল্যাটের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা এবং অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় ছিল। মৃতদেহের ডান চোখে ফাঙ্গাসের মতো সাদা আবরণ দেখা গিয়েছিল।
অনুসন্ধানে ওই ফ্ল্যাটের নোংরা পরিবেশের সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ খুঁজে পাওয়া গেলেও, সন্তানরা তাঁকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেছিলেন বা ভরণপোষণ দেননি—এমন অভিযোগের অকাট্য কোনো প্রমাণ মেলেনি। মৃত্যু ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক, রহস্যের জট এবং সার্বিক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সংবাদমাধ্যম অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে।