খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি:
চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রাইভেট পড়ানোর নামে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে (১৪) দীর্ঘ দিন ধরে একাধিকবার ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর অভিযোগে মিজানুর রহমান (৪৫) নামের এক স্কুল শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযুক্ত শিক্ষক জেলা শহরের অন্যতম বিদ্যাপীঠ নবাবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের (টাউন হাইস্কুল) সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট মামলা দায়েরের পর গত বৃহস্পতিবার (০৪ জুন) দুপুরে আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সাল থেকে ওই ছাত্রীকে নিজের কাছে প্রাইভেট পড়াতেন শিক্ষক মিজানুর রহমান। শিক্ষকতার মতো একটি পবিত্র পেশার আড়ালে লুকিয়ে তিনি ছাত্রীর সরল বিশ্বাস ও অবুঝ বয়সের সুযোগ নেন। পড়াশোনায় ভালো ফলের প্রলোভন ও পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে তিনি ওই শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ দিন ধরে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। লোকলজ্জা এবং শিক্ষকের দেওয়া চরম হুমকির কারণে ভুক্তভোগী ছাত্রীটি দীর্ঘ দিন এই নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করতে বাধ্য হয়।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসেও তার ওপর একইভাবে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। দিনের পর দিন এই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অবশেষে মেয়েটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং সম্পূর্ণ বিষয়টি তার পরিবারের সদস্যদের কাছে খুলে বলে।
শিক্ষকের এমন অনৈতিক ও বিকৃত আচরণের কথা জানাজানি হলে স্থানীয় এলাকাবাসী, অভিভাবক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত শিক্ষক মিজানুর রহমানকে অবরুদ্ধ করে গণপিটুনি দেয়। খবর পেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং উত্তেজিত জনতার হাত থেকে আহত অবস্থায় শিক্ষককে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরবর্তীতে পুলিশি পাহারায় তাকে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়। চিকিৎসা শেষে তাকে থানায় নিয়ে গিয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে পুলিশ।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর অভিভাবক বাদী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একরামুল হোসাইন জানান, শিক্ষার্থীর পরিবারের দেওয়া এজাহারের ভিত্তিতে মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে সংঘটিত ধর্ষণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে আসামিকে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আদালতে সোপর্দ করা হলে বিজ্ঞ বিচারক তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এছাড়া ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর ডাক্তারি পরীক্ষা ও আইনি সহায়তার জন্য পুলিশ সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| অভিযুক্তের নাম ও বয়স | মিজানুর রহমান (৪৫) |
| পদবি ও প্রতিষ্ঠান | সহকারী শিক্ষক, নবাবগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় (টাউন হাইস্কুল) |
| ভুক্তভোগী | অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী (বয়স: ১৪ বছর) |
| অপরাধের প্রকৃতি | প্রাইভেট পড়ানোর প্রলোভনে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ |
| ঘটনার সময়কাল | ২০২৪ সাল থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত |
| আইনি পদক্ষেপ | নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সদর থানায় মামলা |
| বর্তমান অবস্থা | বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে জেলহাজতে প্রেরণ |
একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের কাছ থেকে এমন কলঙ্কজনক আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মনে করছেন স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা এই ঘটনার দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি এমন জঘন্য অপরাধ করার সাহস না পায়। একই সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং শিক্ষকদের নৈতিকতা বজায় রাখতে নজরদারি ও কাউন্সিলিং আরও বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্পাদকীয় মন্তব্য: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো আলো ছড়ানোর পবিত্র স্থান। সেখানে যদি অভিভাবকতুল্য কোনো শিক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তবে তা সমাজ ব্যবস্থার জন্য এক চরম অশনিসংকেত। এই ধরনের নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।