খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩ মে ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে এক নজিরবিহীন ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সদ্য বিদায়ী এপ্রিল মাসেও দেশে ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে, যা টানা পঞ্চম মাসের মতো এই উচ্চমাত্রা বজায় রাখল। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশে মোট ৩১২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী গতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকেই দেশে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে ৩০০ কোটি ডলারের কোটা অতিক্রম করছে। নিচে গত পাঁচ মাসের রেমিট্যান্স প্রবাহের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| মাস | রেমিট্যান্সের পরিমাণ (মার্কিন ডলারে) |
| ডিসেম্বর | ৩২২ কোটি ডলার |
| জানুয়ারি | ৩১৭ কোটি ডলার |
| ফেব্রুয়ারি | ৩০২ কোটি ডলার |
| মার্চ | ৩৭৫ কোটি ডলার (সর্বোচ্চ রেকর্ড) |
| এপ্রিল | ৩১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার |
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশে ৩৭৫ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একক কোনো মাসে আসা সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড। এপ্রিল মাসে প্রবাহ কিছুটা কমলেও তা ৩ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং ব্যাংকারদের মতে, বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো:
১. ধর্মীয় উৎসব ও ঈদ: এপ্রিল মাসে পবিত্র ঈদুল ফিতর অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাধারণত উৎসবের সময়ে প্রবাসীরা তাদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের প্রয়োজনেই দেশে তুলনামূলক বেশি অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। এই ধারাবাহিকতা আগামী ঈদুল আজহা পর্যন্ত বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২. বিনিময় হারের সুবিধা: বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলারের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রবাসীরা এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে বা বৈধ পথে অর্থ পাঠালে আগের চেয়ে বেশি টাকা পাচ্ছেন। এই আকর্ষণীয় বিনিময় হার প্রবাসীদের হুন্ডির পরিবর্তে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করছে।
৩. ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি: মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে অনেক প্রবাসী ভবিষ্যতে অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় সঞ্চিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
টানা পাঁচ মাস ধরে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসাকে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তারা কিছু সতর্কতামূলক পরামর্শও প্রদান করেছেন।
রিজার্ভ সুরক্ষা: বৈদেশিক মুদ্রার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় বর্তমান রিজার্ভের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। রেমিট্যান্সের এই প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে আমদানির দায় পরিশোধ ও বৈদেশিক ঋণের কিস্তি প্রদান সমন্বয় করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সতর্ক অবস্থান: মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা জ্বালানি তেলের দাম ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এমতাবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক ধারা মে ও জুন মাসেও অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে কুরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স প্রবাহে আবারও জোয়ার আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রণোদনা প্রদান এবং প্রক্রিয়া সহজীকরণ করার ফলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, টানা পাঁচ মাস ৩ বিলিয়ন ডলারের ওপর রেমিট্যান্সের স্থিতি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ডলার সংকটের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, প্রবাসীদের এই আয়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে।