খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় আধিপত্য বিস্তার ও একটি চায়ের দোকান উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে চার ঘণ্টাব্যাপী এক ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষ চলাকালে লড়াকু দুই পক্ষের লোকজনের মাথায় হেলমেট এবং বুকে বিশেষ প্রতিরক্ষা জ্যাকেট পরা ছিল। আজ রোববার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত সদর উপজেলার নাটাই উত্তর ইউনিয়নের থলিয়ারা গ্রামে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে নারীসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন এবং নাটাই-অষ্টগ্রাম আঞ্চলিক সড়কে দীর্ঘ তিন ঘণ্টা যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে।
থলিয়ারা গ্রামের মিন্দান আলী (ছোট গোষ্ঠী) এবং ভূঁইয়া বাড়ি (মধ্যি বাড়ি গোষ্ঠী)-র মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলছিল। মিন্দান আলী গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন মো. জোবায়ের এবং ভূঁইয়া বাড়ি গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন মো. জয়নাল আবেদীন।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, থলিয়ারা গ্রামের ভূঁইয়া বাড়ির পুকুরপাড়ে শিরু মিয়া (স্থানীয়ভাবে জারু মিয়া নামেও উল্লিখিত) নামের এক ব্যক্তির একটি চায়ের দোকান রয়েছে। সেখানে নিয়মিত টেলিভিশন চলায় সারাদিন মানুষ ও যুবকদের জটলা লেগে থাকত। অভিযোগ রয়েছে, ওই জটলা থেকে পাশ দিয়ে যাতায়াতকারী নারী ও মেয়েদের উদ্দেশ্য করে অপ্রীতিকর মন্তব্য করা হতো। এর পরিপ্রেক্ষিতে মিন্দান আলী বা ছোট গোষ্ঠীর লোকজন চায়ের দোকানটি উচ্ছেদের দাবি জানায়। সম্প্রতি গ্রামের একটি সালিসে দোকানটি উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হলেও ভূঁইয়া বাড়ির জয়নাল আবেদীনের পক্ষ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে।
এই দোকান উচ্ছেদের বিরোধকে কেন্দ্র করে আজ সকাল ৯টার দিকে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ও কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের লোকজন বল্লম, এককাইট্টা (এক প্রকার দেশি অস্ত্র), লাঠি, ছুরি, রামদা ও চায়নিজ কুড়ালের মতো মারাত্মক দেশি-বিদেশি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের সময় রাস্তা থেকে টিনের বেড়া সামনে রেখে একে অপরকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও পেট্রল বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এই সহিংসতা গ্রামের ভেতর থেকে নাটাই-অষ্টগ্রাম আঞ্চলিক সড়ক ও পাশের ফসলি জমিতে ছড়িয়ে পড়ে।
সংঘর্ষ চলাকালে উভয় পক্ষের বেশ কিছু দোকানপাট ও বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আঞ্চলিক সড়কে দুই পক্ষ অবস্থান নেওয়ায় সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে, যার ফলে অষ্টগ্রাম উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
বেলা ১১টার দিকে খবর পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার পুলিশের একাধিক দল এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টায় বেলা একটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এই সংঘর্ষে নারীসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে তিনজনকে উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে আহতদের মধ্যে পিঠে ‘এককাইট্টা’ বিদ্ধ হওয়া এক ব্যক্তির অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
নাটাই উত্তর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইয়াকুব আলী ভূঁইয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, চায়ের দোকান উচ্ছেদ নিয়ে কয়েক দিন আগের সালিসি সিদ্ধান্ত একটি পক্ষ অমান্য করায় এই সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতির পর মিন্দান আলী গোষ্ঠীর মো. জোবায়ের এবং ভূঁইয়া বাড়ির জয়নাল আবেদীনের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, চায়ের দোকান উচ্ছেদের মতো ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সংঘর্ষে জড়িত থাকার সন্দেহে চারজনকে আটক করেছে। এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং পরবর্তী সংঘর্ষ এড়াতে থলিয়ারা গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। উভয় পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ প্রাপ্তিসাপেক্ষে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার থলিয়ারা গ্রামে সংঘটিত সংঘর্ষের মূল তথ্য, ব্যবহৃত উপাদান এবং বর্তমান পরিস্থিতি নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| সংঘর্ষের বিবরণ ও খাত | সংশ্লিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যানগত উপাত্ত |
| সংঘর্ষের স্থান | থলিয়ারা গ্রাম, নাটাই উত্তর ইউনিয়ন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর। |
| সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষ | মিন্দান আলী গোষ্ঠী (ছোট গোষ্ঠী) বনাম ভূঁইয়া বাড়ি গোষ্ঠী (মধ্যি বাড়ি)। |
| উভয় পক্ষের নেতৃত্ব | মো. জোবায়ের (মিন্দান আলী) এবং মো. জয়নাল আবেদীন (ভূঁইয়া বাড়ি)। |
| সংঘর্ষের স্থায়িত্বকাল | ৪ ঘণ্টা (সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত)। |
| ব্যবহৃত আত্মরক্ষা সামগ্রী | মাথায় হেলমেট এবং বুকে প্রতিরক্ষা জ্যাকেট। |
| ব্যবহৃত অস্ত্র ও বিস্ফোরক | বল্লম, এককাইট্টা, লাঠি, ছুরি, রামদা, চায়নিজ কুড়াল, ইটপাটকেল ও পেট্রল বোমা। |
| আহত ও আটকের সংখ্যা | আহত অন্তত ১৫ জন (১ জন ঢাকায় প্রেরিত); সন্দেহভাজন আটক ৪ জন। |
| যোগাযোগ ও জানমালের ক্ষতি | ৩ ঘণ্টা আঞ্চলিক সড়ক অবরুদ্ধ; বাড়িঘর ও দোকানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। |
| বর্তমান প্রশাসনিক অবস্থা | পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে; এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন। |