খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে এবার এক অভিনব ও ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ববাসী। আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এই বিশ্বমঞ্চে মোট ‘সাড়ে সাত জোড়া’ অর্থাৎ ১৫ জন ভাইয়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই তালিকায় আট জোড়া ভাইয়ের থাকার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে চোটের (ইনজুরি) কারণে একজন খেলোয়াড় দল থেকে ছিটকে যান। ফলে গাণিতিক হিসাবটি পূর্ণ জোড়া থেকে কমে ‘সাড়ে সাত জোড়া’য় এসে দাঁড়িয়েছে। এই খেলোয়াড়দের মধ্যে কেউ খেলছেন একই দেশের হয়ে, আবার কেউ রাজনৈতিক বা পারিবারিক আবহের কারণে প্রতিনিধিত্ব করছেন ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় দলের।
বিশ্বকাপ ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে সহোদর ভাইদের একই দলের হয়ে খেলার নজির থাকলেও, ভিন্ন দলের হয়ে একে অপরের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা বেশ বিরল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মাত্র দুবার ভাইয়ে ভাইয়ে সরাসরি মাঠের লড়াই দেখার সুযোগ হয়েছে। তবে এই দুটি ঐতিহাসিক ম্যাচেই মুখোমুখি হওয়া ভাইদের জুটিটি ছিল মাত্র এক জোড়াই—জার্মানির জেরোম বোয়াটেং এবং ঘানার কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেং।
২০১০ বিশ্বকাপ: এই আসরের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে জার্মানি ও ঘানা পরস্পরের মুখোমুখি হয়। ম্যাচটিতে ঘানাকে ১-০ গোলে পরাজিত করে জার্মানি। সেই ম্যাচে ছোট ভাই জেরোম বোয়াটেং মাঠে নেমেছিলেন জার্মানির হয়ে এবং তাঁর বড় ভাই কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেং পরেছিলেন ঘানার জার্সি।
২০১৪ বিশ্বকাপ: প্রথম সাক্ষাতের ঠিক চার বছর পর ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বেও এই দুই ভাই একই দলের হয়ে পুনরায় মুখোমুখি হন। তবে এই ম্যাচটি ১-০ ফলাফলের পরিবর্তে ২-২ গোলে ড্রয়ে শেষ হয়।
এবারের বিশ্বকাপে যে ‘সাড়ে সাত জোড়া’ ভাই অংশ নিচ্ছেন, তাদের মধ্যে চার জোড়া ভাই একই জাতীয় দলের স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তবে চোটের কারণে একটি জোড়া আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা ভাইদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
ফ্রান্স: ফরাসি জাতীয় দলে রক্ষণভাগ ও মধ্যমাঠের শক্তি বাড়াতে একসঙ্গে ডাক পেয়েছেন থিও হার্নান্দেজ ও লুকাস হার্নান্দেজ।
নেদারল্যান্ডস: ডাচ স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল জুরিয়েন টিম্বার ও কুইনটেন টিম্বারকে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে চোটের (ইনজুরি) কারণে জুরিয়েন টিম্বার বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যান। তাঁর এই অনুপস্থিতির কারণেই এবারের আসরে ভাইদের সংখ্যাটি আট জোড়া থেকে কমে ‘সাড়ে সাত জোড়া’য় রূপ নিয়েছে।
কেপ ভার্দে: বিশ্বকাপে অভিষিক্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা এই দলটির হয়ে মাঠ মাতাবেন লারোস দুয়ার্তে ও দেরয় দুয়ার্তে।
কুরাসাও: কেপ ভার্দের মতো কুরাসাও দলটিও এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলছে। এই নবাগত দলটির স্কোয়াডে স্থান পেয়েছেন লিয়ান্দ্রো বাকুনা ও জুনিনিও বাকুনা।
বিশ্বায়নের এই যুগে ফুটবলারদের দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং পারিবারিক মূল শিকড়ের টানে এবার চার জোড়া ভাইকে দেখা যাবে সম্পূর্ণ আলাদা চারটি দেশের জার্সি গায়ে একে অপরের বিপক্ষে বা ভিন্ন গ্রুপে লড়তে। নিচে এই চার জোড়া ভাইয়ের বিস্তারিত তথ্য ও তাদের দল নির্বাচনের প্রেক্ষাপট একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ভাইদের নাম ও বয়স | জন্মস্থান | ভিন্ন দল বেছে নেওয়ার পটভূমি ও বর্তমান দল |
|
১. গুয়েলা দুয়ে ও দেজিরে দুয়ে |
ফ্রান্স | দুই ভাইয়ের জন্ম ফ্রান্সে হলেও বড় ভাই গুয়েলা দুয়ে তাঁর বাবার জন্মভূমি আইভরিকোস্ট জাতীয় দলকে বেছে নেন। অন্যদিকে ছোট ভাই দেজিরে দুয়ে খেলছেন ফ্রান্সের হয়ে। |
|
২. ইনাকি উইলিয়ামস (৩২) ও নিকো উইলিয়ামস (২৩) |
বাস্ক প্রদেশ, স্পেন | দুই ভাই স্পেনে জন্মগ্রহণ করলেও ৩২ বছর বয়সী বড় ভাই ইনাকি উইলিয়ামস তাঁর বাবা-মায়ের আদি জন্মভূমি ঘানার হয়ে খেলছেন। অপরদিকে ২৩ বছর বয়সী ছোট ভাই নিকো উইলিয়ামস খেলছেন স্পেনের হয়ে। |
|
৩. ডেরিক লাকাসেন ও ব্রায়ান ব্রবি |
নেদারল্যান্ডস / ঘানা বংশোদ্ভূত | এই দুই ভাইয়ের মা একই হলেও বাবা ভিন্ন। ডেরিক লাকাসেন খেলেন ঘানার সেন্টারেব্যাক হিসেবে এবং ব্রায়ান ব্রবি খেলছেন নেদারল্যান্ডসের ব্যাকআপ স্ট্রাইকার হিসেবে। |
|
৪. জন সউতার ও হ্যারি সউতার |
অ্যাবেরডিন, স্কটল্যান্ড | স্কটল্যান্ডে জন্ম নেওয়া দুই ভাইয়ের মা অস্ট্রেলিয়ান। ছোট ভাই হ্যারি সউতার সাত বছর আগে নাগরিকত্ব পেয়ে খেলছেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে। দুই বছরের বড় ভাই জন সউতার খেলছেন স্কটল্যান্ডের হয়ে। |
১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের মূল পর্বের গ্রুপ বিন্যাস ও সময়সূচি অনুযায়ী, প্রাথমিক ধাপে ভিন্ন ভিন্ন দলে খেলা এই ভাইদের একে অপরের মুখোমুখি হওয়ার কোনো সরাসরি সম্ভাবনা নেই। তবে বিশ্বকাপের মূল আসর শুরুর পূর্ববর্তী প্রস্তুতি ম্যাচে ইতিমধ্যেই দুই ভাইয়ের দলের মাঠের লড়াই সম্পন্ন হয়েছে।
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক প্রস্তুতি ম্যাচে আইভরিকোস্টের মুখোমুখি হয়েছিল ফ্রান্স। সেই ম্যাচে ফ্রান্স ২-১ ব্যবধানে জয়লাভ করে। ফ্রান্সের বিপক্ষে আইভরিকোস্টের হয়ে একমাত্র গোলটি করেন গুয়েলা দুয়ে, অন্যদিকে তাঁর ভাই দেজিরে দুয়ে সেই সময় গ্যালারিতে বসে ম্যাচটি উপভোগ করেন। ম্যাচ শেষে পারিবারিক সৌহার্দ্য প্রকাশ করে গুয়েলা দুয়ে জানান:
“হ্যাঁ, ম্যাচের আগে আমাদের মধ্যে বেশ কিছু রসাত্মক খুনসুটি হয়েছে। তবে দিন শেষে আমরা একটি একক পরিবার এবং আমরা প্রত্যেকেই একে অপরের সাফল্যে ও অর্জনে ভীষণ আনন্দিত।”
গত কয়েক দশক ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আফ্রিকা অঞ্চলের মানুষের ব্যাপক অভিবাসনের ফলে আফ্রিকান জাতীয় ফুটবল দলগুলোর সামনে প্রতিভার এক নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। আফ্রিকান দেশগুলো এখন ইউরোপে বসবাসকারী এবং সেখানে জন্মগ্রহণকারী প্রবাসী বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের নিজেদের জাতীয় দলে ব্যাপকভাবে অন্তর্ভুক্ত করছে।
এর ফলে আলজেরিয়া, কেপ ভার্দে, ডিআর কঙ্গো, মরক্কো, সেনেগাল এবং তিউনিসিয়ার মতো বিশ্বকাপ খেলা দলগুলোর ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াডের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে প্রবাসীদের দ্বারা। পরিসংখ্যান ও দলীয় তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই দলগুলোতে এখন নিজ দেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়ের সংখ্যার চেয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা ফুটবলারদের সংখ্যাই তুলনামূলকভাবে বেশি।