খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় ৯ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের নির্মম ও চাঞ্চল্যকর ঘটনায় মূল অভিযুক্ত আবদুর রহিমকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গাজীপুরের একটি গোপন আস্তানা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আজ শুক্রবার সকালে গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে কেন্দুয়া থানায় হস্তান্তর করেছে র্যাব।
স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও ভুক্তভোগী শিশুর পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার দুপুরে বাড়ির পাশের হাওর থেকে গরু আনতে গিয়েছিল চতুর্থ শ্রেণীর ওই শিক্ষার্থী। হাওরের নির্জন স্থানে শিশুটিকে একা পেয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে একই এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহিম।
এদিকে বাড়ি ফিরতে দেরি হওয়ায় শিশুটির মা তাকে খুঁজতে বের হন। একপর্যায়ে হাওরের একটি গাছের নিচে তল্লাশি চালানোর সময় তিনি অভিযুক্ত রহিমকে দেখতে পান। তাকে দেখে রহিম দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য স্থানীয় এক গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। লোকলজ্জার ভয় এবং তাৎক্ষণিক পরিস্থিতির কারণে প্রথমে তাকে বাড়িতেই রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল।
অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, ঘটনার পরপরই স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী মাতবর বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় না নিয়ে সামাজিকভাবে ধামাচাপা দেওয়ার নিকৃষ্ট চেষ্টা চালান। এলাকার মাতবর আবু তাহের এবং আবু বক্কর ভুক্তভোগী পরিবারটিকে থানায় মামলা করতে বাধা দেন। একই সাথে ঘটনাটি গোপন রাখার বিনিময়ে পরিবারটিকে ৫০ হাজার টাকার প্রলোভন দেখানো হয় এবং নানাবিধ চাপ সৃষ্টি করা হয়।
তবে সমস্ত ভয়ভীতি ও প্রলোভন উপেক্ষা করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয় শিশুটির পরিবার। গত সোমবার দুপুরে হঠাৎ করেই শিশুটির শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। তখন তাকে দ্রুত কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার দুপুরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকরা তাকে নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি ও মাতবরদের বাধা উপেক্ষা করে অবশেষে মঙ্গলবার দুপুরে শিশুটির বাবা বাদী হয়ে আবদুর রহিমকে একমাত্র আসামি করে কেন্দুয়া থানায় একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন।
সহজে পুরো ঘটনাটি অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি সময়ানুক্রমিক টেবিল দেওয়া হলো:
| তারিখ ও দিন | ঘটনার বিবরণ |
| গত শনিবার (দুপুর) | হাওরে গরু আনতে গেলে ৯ বছরের শিশুটিকে একা পেয়ে ধর্ষণ করে আবদুর রহিম। |
| শনিবার থেকে রোববার | লোকলজ্জা ও মাতবরদের চাপের কারণে গ্রাম্য চিকিৎসকের মাধ্যমে বাড়িতেই চিকিৎসা প্রদান। |
| গত সোমবার (দুপুর) | শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে শিশুটিকে কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি। |
| গত মঙ্গলবার (দুপুর) | উন্নত চিকিৎসার জন্য নেত্রকোনা জেলা হাসপাতালে স্থানান্তর এবং থানায় মামলা দায়ের। |
| গত বৃহস্পতিবার (সন্ধ্যা) | র্যাবের বিশেষ অভিযানে গাজীপুর থেকে পলাতক আসামি আবদুর রহিম গ্রেপ্তার। |
| আজ শুক্রবার (সকাল) | আসামিকে কেন্দুয়া থানায় হস্তান্তর এবং আদালতে সোপর্দের প্রক্রিয়া শুরু। |
ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা অত্যন্ত ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন:
“আমি প্রথম থেকেই আইনের আশ্রয় নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মাতবর আবু তাহের ও আবু বক্কর মীমাংসার নামে আমাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। আমরা এই পৈশাচিক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং ধর্ষক রহিমের দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসি চাই। পাশাপাশি যারা অপরাধীকে আড়াল করতে চেয়েছিল, তাদেরও বিচার চাই।”
এদিকে ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর এবং মামলার খবর পেয়ে সোমবার সকাল থেকেই অভিযুক্ত দুই মাতবর আবু তাহের ও আবু বক্কর এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাদের মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
এই বিষয়ে কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদি মাকসুদ আজ সকালে গণমাধ্যমকে জানান, র্যাবের সহায়তায় মামলার প্রধান আসামি আবদুর রহিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে আজই আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, আক্রান্ত শিশুটি বর্তমানে চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। গ্রাম্য সালিশের নামে যারা অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং পরিবারটিকে আইনি সহায়তা নিতে বাধা দিয়েছে, তদন্ত সাপেক্ষে সেই মাতবরদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।