খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
বাংলা কথাসাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র, একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেন-এর আজ জন্মদিন।
বাংলাদেশের সাহিত্যভুবনে তিনি এক অনন্য নাম। তাঁর উপন্যাস, গল্প ও প্রবন্ধে প্রতিফলিত হয়েছে আমাদের সময়ের সামাজিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, মানুষের স্বপ্ন-সংগ্রাম এবং জাতির আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য তাঁর সাহিত্যকর্মে পেয়েছে নতুন ব্যঞ্জনা ও গভীরতা। তাঁর রচনাসমূহ ইংরেজি, রুশ, মালয় ও কানাড়া ভাষাসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে বিশ্বসাহিত্যের পাঠকমহলেও সমাদৃত হয়েছে।
১৯৪৭ সালের ১৪ জুন রাজশাহী শহরে তাঁর জন্ম। পৈতৃক নিবাস লক্ষ্মীপুর জেলার
হাজিরপাড়া গ্রামে। বাবা এ. কে. মোশাররফ হোসেন এবং মা মরিয়ামুন্নেছা বকুলের সাত সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ।
শৈশবের শিক্ষাজীবন শুরু হয় বগুড়ার লতিফপুর প্রাইমারি স্কুলে। পরবর্তীতে রাজশাহীর লোকনাথ গার্লস স্কুল থেকে ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। এরপর রাজশাহী মহিলা কলেজে অধ্যয়ন শেষে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-এর বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তাঁর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয় সংস্কৃতি, সাহিত্যচর্চা ও রাজনৈতিক সচেতনতার এক নতুন অধ্যায়। ১৯৬৭ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স এবং ১৯৬৮ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনের সূচনা ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি-তে গবেষণা সহকারী হিসেবে। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি অভিধান প্রকল্প, বিজ্ঞান বিশ্বকোষ, লেখক অভিধান, চরিতাভিধান এবং বিখ্যাত লেখকদের রচনাবলি প্রকাশসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা প্রকল্পের দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করেন। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় সম্পাদনা করেন শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় পত্রিকা ধান শালিকের দেশ। ১৯৯৭ সালে তিনি বাংলা একাডেমির প্রথম নারী পরিচালক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
সাহিত্যজীবনের সূচনা গল্প দিয়ে। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ উৎস থেকে নিরন্তর প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। এরপর একের পর এক উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ ও প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে। তাঁর রচিত উপন্যাসের সংখ্যা দুই ডজনের কাছাকাছি, গল্পগ্রন্থ ও প্রবন্ধগ্রন্থও পেয়েছে পাঠকপ্রিয়তা ও সমালোচকদের প্রশংসা।
তাঁর সৃষ্টির মধ্যে হাঙর নদী গ্রেনেড বাংলা সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় সংযোজন। এই উপন্যাস অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন একই নামের কালজয়ী চলচ্চিত্র। জানা যায়, কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়-ও এই উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, যদিও নানা কারণে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর একাধিক সাহিত্যকর্ম বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটক হিসেবেও নির্মিত হয়েছে।
সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদকসহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক গভীর বেদনারও সাক্ষী। তাঁর কন্যা ফারিয়া লারা ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট প্রশিক্ষক। ১৯৯৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার পোস্তগোলায় এক বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর অকালমৃত্যু ঘটে, যা সেলিনা হোসেনের জীবনে এক অপূরণীয় শোকের স্মারক হয়ে আছে।
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার প্রশ্নে আজও তিনি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, সক্রিয় ও সম্মানিত। তাঁর কলম আমাদের ইতিহাস, মানবতা ও মুক্তির স্বপ্নকে নতুন করে চিনতে শেখায়।
জন্মদিনে নন্দিত এই কথাসাহিত্যিকের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিক অভিনন্দন ও অফুরন্ত শুভকামনা। সুস্থতা, দীর্ঘায়ু এবং সৃজনশীলতার দীপ্তিতে তিনি আরও বহুদিন আলোকিত করুন বাংলা সাহিত্যাঙ্গন।
শুভ জন্মদিন, সেলিনা হোসেন।