ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে তাঁর দেশের অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ইসরায়েল কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের অধীনস্থ কোনো রাষ্ট্র নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি এই মন্তব্য করেন। বেন-গভির জোর দিয়ে বলেন, ইসরায়েল একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। ফলশ্রুতিতে, নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থের পরিপন্থী বা ক্ষতিকর হতে পারে—এমন কোনো আন্তর্জাতিক সমঝোতা, শর্ত বা চুক্তি ইসরায়েল কোনো অবস্থাতেই মেনে নেবে না।
বেন-গভিরের সামরিক অবস্থান ও হিজবুল্লাহ প্রসঙ্গ
জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সামরিক ও সাংগঠনিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি বা রাজনৈতিক আপসে যাবে না। তিনি পরিষ্কারভাবে জানান, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) অভিযান চালিয়ে লেবাননের যেসকল এলাকাকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবকাঠামো ও অবস্থানমুক্ত করেছে, কৌশলগত কারণে সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তসংলগ্ন বসতিগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত বা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, এমন কোনো পূর্ববর্তী পরিস্থিতিতে তাঁরা আর ফিরে যাবেন না। ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে যেকোনো ধরনের হামলা চালানো হলে তার কঠোর ও তাৎক্ষণিক জবাব দিতে দেশটির সামরিক বাহিনী বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্নমত ও জো কেন্টের পর্যবেক্ষণ
ইসরায়েলি মন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত মহলে ভিন্নধর্মী বিশ্লেষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য নীতি সংক্রান্ত মতপার্থক্যের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে পদত্যাগ করা যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের সাবেক প্রধান জো কেন্ট বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর নিজস্ব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির উদ্যোগকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
জো কেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া একটি পোস্টে উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। তাঁর মতে, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে সামরিক, কৌশলগত ও গোয়েন্দা সহায়তা প্রদান করা হয়, তা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলে চলমান যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেতে পারে। কেন্ট অভিযোগ করেন যে, অতীতেও বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েল এই ধরনের আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক সমঝোতা ভেস্তে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। মার্কিন প্রশাসন যদি এখনই যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে ভবিষ্যতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
সংবাদে উল্লিখিত দুই দেশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রধান দাবি ও অবস্থান নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও পদবি | দেশের নাম | মূল বক্তব্য ও কৌশলগত অবস্থান |
|
ইতামার বেন-গভির (জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী) |
ইসরায়েল |
* ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের অধীনস্থ নয়, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। * হিজবুল্লাহর সক্ষমতা ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত কোনো আপস নেই। * মুক্ত করা অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। |
|
জো কেন্ট (সাবেক প্রধান, ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টার) |
যুক্তরাষ্ট্র |
* যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ ইতিবাচক। * ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা স্থগিত করা উচিত। * অতীতে ইসরায়েল সমঝোতা ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। |
বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ইতামার বেন-গভিরের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে। তবে ইসরায়েলি প্রশাসনের অভ্যন্তরে থাকা অতি-ডানপন্থী ও রক্ষণশীল নেতারা যে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নিজেদের সামরিক নীতি পরিবর্তন করতে রাজি নন, বেন-গভিরের এই অনমনীয় বিবৃতি তারই বাস্তব প্রমাণ বহন করে। অন্যদিকে, মার্কিন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছে যে, ইসরায়েলের ওপর ওয়াশিংটনের সামরিক নির্ভরতা ও একচেটিয়া সহায়তা নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনা সম্ভব নয়।



