খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
বগুড়া-২ নির্বাচনী আসনের অন্তর্ভুক্ত শিবগঞ্জ উপজেলাকে প্রশাসনিকভাবে পুনর্গঠন করে মোকামতলা নামে একটি নতুন উপজেলা গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের এই নির্বাচনী এলাকায় নতুন উপজেলা গঠনের পাশাপাশি শিবগঞ্জ ও নবগঠিত মোকামতলায় যথাক্রমে ‘মীরবাড়ী’ এবং ‘সীমান্ত’, ‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’ নামে নতুন চারটি ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক কর্তৃক এই সংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশের পর থেকেই ইউনিয়নগুলোর নামকরণ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় জনসাধারণের দাবি অনুযায়ী, ‘স্বর্ণগ্রাম’ ব্যতীত বাকি তিনটি ইউনিয়নের নামকরণ মূলত প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ি এবং তাঁর দুই ছেলের নামের সাথে মিল রেখে করা হয়েছে। তবে এই বিষয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান জানান, তিনি সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঠানো লিখিত সুপারিশ ও প্রস্তাবের ভিত্তিতে এবং যথাযথ গণশুনানি সম্পন্ন করেই এই নতুন ইউনিয়নগুলোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন। নামকরণের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো প্রকার ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার বা অনুরোধ করা হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে গঠিত নতুন ইউনিয়নগুলোর সীমানা, অন্তর্ভুক্ত মৌজা এবং জনসংখ্যা নিচে ছকের মাধ্যমে বিস্তারিত উপস্থাপন করা হলো:
| ইউনিয়নের নাম | যে ইউনিয়ন ভেঙে গঠিত | অন্তর্ভুক্ত মৌজার নামসমূহ | মোট মৌজা | মোট জনসংখ্যা |
| সীমান্ত ইউনিয়ন | সৈয়দপুর | মানকৈর, ভবানীপুর, অভিরামপুর, খেরুয়াপাড়া, কিশোরীপুর, জগন্নাথপুর, আমঝুপি, জীবনপুর, কুকি কালিদাস ও কুকি জগন্নাথপুর | ১১টি | ১৬,২৬৭ জন |
| দিগন্ত ইউনিয়ন | দেউলী | ভরিয়া (ভৈরা), মেঘাখর্দ্দ, alampur বা আলমপুর, রহবল, সাওয়ালদহ, কৃষ্ণপুর, তালিবপুর ও বোয়ালমারী | ৮টি | ১৭,৭৫৯ জন |
| মীরবাড়ী ইউনিয়ন | শিবগঞ্জের তিনটি ইউনিয়নের অংশ | ফেনীগ্রাম, সৈয়দপুর, চন্দনপুর, দোপাড়া, তেয়াইল, গোরনা, ধামাহার, বাদলদীঘি, বেতগাড়ী, রামকান্দি, চকগোপাল, ডাবুর, চককানু, হরিপুর ও গোপীনাথপুর | ১৫টি | ১৮,৯২৪ জন |
| স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন | নির্দিষ্ট নয় | গেজেট অনুযায়ী নতুন গঠিত এলাকা | নির্দিষ্ট নয় | নির্দিষ্ট নয় |
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৩রা জুন শিবগঞ্জ উপজেলায় অনুষ্ঠিত একটি সাধারণ সভায় স্থানীয় বিএনপির একজন নেতা নতুন ইউনিয়নগুলোর এই নামকরণের বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সভায় উপস্থিত সকল সদস্যের সর্বসর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসন নামগুলো লিখিত আকারে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রেরণ করে। এরপর জেলা প্রশাসক গত ১১ই জুন মীরবাড়ী ইউনিয়ন এবং ১৪ই জুন সীমান্ত ও দিগন্ত ইউনিয়ন গঠনের চূড়ান্ত গেজেট জারি করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান এই প্রসঙ্গে জানান, নতুন ইউনিয়ন গঠনের লিখিত আবেদন আসার পর তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত বা যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটির সুপারিশই জেলা প্রশাসকের নিকট পাঠানো হয়। তবে নির্দিষ্টভাবে কারা প্রথম এই নামগুলো প্রস্তাব করেছিলেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর স্মরণে নেই বলে তিনি জানান। শিবগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সভাপতি খালিদ হাসান আরমান অবশ্য এই নামকরণে কোনো দোষ দেখছেন না; বরং প্রতিমন্ত্রীর বাড়ি ও ছেলেদের নামে ইউনিয়ন হওয়ায় এলাকার মানুষ খুশি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
নতুন ইউনিয়ন গঠনের পাশাপাশি শিবগঞ্জ পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং ভৌগোলিক পরিবর্তনের কারণে বিহার, রায়নগর, বুড়িগঞ্জ, কিচক ও আটমুল ইউনিয়নকে নতুন করে পুনর্গঠন করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, তাঁর বড় ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত যুক্তরাজ্য থেকে পড়াশোনা শেষ করে এক বছর আগে দেশে ফিরে রাজনীতি ও পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হন এবং সম্প্রতি শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক মনোনীত হন। তিনি সাময়িকভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক নির্বাচিত হলেও পরদিনই পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে ছোট ছেলে মীর সাকলাইন আলম দিগন্ত বর্তমানে যুক্তরাজ্যে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন।
ইউনিয়ন পরিষদ আইন ২০০৯-এর ১১(১) ধারা মোতাবেক, জেলা প্রশাসক সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একাধিক গ্রামের সমন্বয়ে ইউনিয়ন ঘোষণা এবং তার নাম নির্ধারণ করার একক ক্ষমতা রাখেন। তবে এই আইনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির নামে ইউনিয়নের নামকরণ করা যাবে না। এই আইনি বাধ্যবাধকতার পরও প্রতিমন্ত্রীর সন্তানদের নামের সাথে মিল রেখে নামকরণ করায় জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি পরিবারের সদস্যদের নামে নামকরণের এই সংস্কৃতিকে পূর্ববর্তী শাসনআমলের সাথে তুলনা করেন।
এই সমালোচনার জবাবে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংসদে বিষয়টিকে একটি ‘অলৌকিক মিল’ বা অলৌকিক ঘটনা বলে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, এই নামকরণ তাঁর ছেলেদের নামে করা হয়নি; বরং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জেলা প্রশাসক এই নামগুলো নির্ধারণ করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা দেন যে, সৈয়দপুর ইউনিয়ন ভেঙে গঠিত নতুন অংশটি গাবতলী ও সোনাতলা উপজেলার সীমান্তবর্তী হওয়ায় তার নাম ‘সীমান্ত’ এবং দেউলী ইউনিয়নের অংশটি গাইবান্ধা জেলার সীমান্তবর্তী ও দূরবর্তী হওয়ায় তার নাম ‘দিগন্ত’ রাখা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া প্রতিমন্ত্রীর নিজস্ব হলফনামা অনুযায়ী, তিনি ১২টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক, যার মধ্যে ‘মীর সীমান্ত ফিলিং站 বা স্টেশন’ এবং ‘মীর দিগন্ত ট্রেডিং এজেন্সি’ নামক দুটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। তবে সংসদে নিজের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তাঁর ছেলেদের প্রকৃত নাম যথাক্রমে মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত, কিন্তু ইউনিয়নের নামের আগে ‘মীর’ শব্দটি যুক্ত নেই। তিনি আরও যোগ করেন যে, দেশে সীমান্ত ব্যাংক, সীমান্ত এক্সপ্রেস কিংবা দিগন্ত টাওয়ারের মতো অনেক স্থাপনা রয়েছে, যার কোনোটিই তাঁর ব্যক্তিগত মালিকানাধীন নয়। সংসদে তাঁর এই বক্তব্যের পর সরকারি দলের সদস্যগণ টেবিল চাপড়ে তাঁর এই বক্তব্যকে সমর্থন জানান।