খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
সাম্প্রতিক সময়ে সুইস ব্যাংকের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক’ (এসএনবি)-এর তথ্যানুযায়ী, গত এক বছরে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে ২০২৪ সালে আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ, ২০২৫ সালের শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁতে (দেশীয় মুদ্রায় যা প্রায় ১২,৬৭৮ কোটি টাকা)।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দশকে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমানতের রেকর্ড। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ৩.২ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ আমানত নিয়ে ভারত শীর্ষে থাকলেও তাদের আমানত আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই আমানতের উল্টো চিত্র বা বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে।
আমানত বৃদ্ধির সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও আনুমানিক হিসাব
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সুইস ব্যাংকই বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের একমাত্র বা প্রধান মাধ্যম নয়। অবৈধ অর্থপ্রবাহের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের একটি বড় অংশ জমা হয় মূলত ১০টি দেশে:
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য
কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া
সিঙ্গাপুর ও হংকং
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়া
কেম্যান আইল্যান্ডস ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস
অতীতের ধারা বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, সুইস ব্যাংকের বাইরে এই দেশগুলোতে আরও বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তরিত হয়েছে। ফলে বিগত দেড় বছরে বাংলাদেশ থেকে মোট অর্থ পাচারের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিগত সরকারগুলোর অর্থ পাচারের তুলনা ও বর্তমান অবস্থান
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে (২০০৯-২০২৩) ব্যাপক অর্থ পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি শ্বেতপত্র কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটির তথ্যমতে, ওই ১৫ বছরে দেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বার্ষিক গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা) পাচার হয়েছে।
বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাঁর একাধিক ভাষণে অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন। এবারের বাজেটেও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সুইস ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সাবেক উপদেষ্টাদের ভূমিকা এখন নতুন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের ভূমিকা ও সমালোচনা
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থ পাচার রোধ ও পাচারকৃত অর্থ দ্রুত ফিরিয়ে আনার জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনা চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরের ভূমিকা: সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুততম সময়ে অর্থ ফেরত আনার আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন। বর্তমানে তাঁর নিজের এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও বিদেশে সম্পদ গড়ার আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে।
উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ: অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) বেশ কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ জমা পড়েছে। সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং আসিফ মাহমুদসহ অনেকের সুইজারল্যান্ড সফর এবং অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নানামুখী আলোচনা চলছে।
সমালোচকদের বক্তব্য: অন্তর্বর্তী সরকার প্রকৃত অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না নিয়ে বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ঢালাওভাবে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানকে হয়রানি করায় দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
অর্থ পাচার রোধে করণীয় ও জনগণের প্রত্যাশা
দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দল-মত নির্বিশেষে সকল অর্থ পাচারকারীর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
১. দলনিরপেক্ষ তদন্ত: অর্থ পাচারকারী বা দুর্নীতিবাজদের কোনো রাজনৈতিক দল বা পরিচয় থাকতে পারে না। তারা আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি—যে দলের সাথেই সম্পৃক্ত থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
২. আইনি সংস্কার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. বেসরকারি খাতের সুরক্ষা: ঢালাও মিডিয়া ট্রায়াল বন্ধ করে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে, যেন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
বিগত দেড় দশক ধরে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ যদি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, তবে তা বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে।