খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলমের বদলির আদেশের সঙ্গে হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ কিংবা অন্য কোনো বিষয়কে যুক্ত করার কোনো সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। তিনি দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেছেন যে, রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় ‘অপরিহার্য’ নন। এটি একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং নিয়মিত দাপ্তরিক প্রক্রিয়া। এর পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রী আরও নিশ্চিত করেছেন যে, প্রত্যাহারকৃত এই কর্মকর্তাকে অতি দ্রুতই নতুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হবে।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রোববার (২১ ২১ জুন) সরকারের পক্ষ থেকে মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এদিন তাকে বর্তমান দায়িত্ব থেকে অবমুক্ত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে সংযুক্ত করে একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত ওই প্রজ্ঞাপনে তাকে কেন এবং কী কারণে ডিসির পদ থেকে আকস্মিক সরানো হয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
প্রজ্ঞাপনে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না থাকায় এবং অতি সম্প্রতি সিলেটের একটি ঐতিহাসিক মাজারের অর্থনৈতিক অনিয়ম নিয়ে তার কঠোর অবস্থানের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। নেটিজেন ও সাধারণ মানুষের একাংশ এই বদলিকে মাজারের অনিয়মের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের ‘শাস্তিস্বরূপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে শুরু করেন।
সারওয়ার আলমের এই আকস্মিক বদলি এবং তা নিয়ে জনমনে সৃষ্ট নানা প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী গণমাধ্যমকে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি নিয়ে মাঠপর্যায়ে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের আলোচনা-সমালোচনার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। সরকারি কর্মকর্তাদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলি করা একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, “একজন কর্মকর্তা একটি নির্দিষ্ট কর্মস্থলে তার নির্ধারিত সময় বা পরিস্থিতি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন এবং পরবর্তীতে অন্য জায়গায় বদলি হবেন, আবার তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে অন্য কোনো কর্মকর্তা এসে সেই দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন—এটাই বাংলাদেশ সরকারের একটি নিয়মিত ও প্রচলিত দাপ্তরিক কার্যক্রম।”
বিশেষ করে সিলেটের মাজারের আয়-ব্যয়ের অনিয়ম চিহ্নিতকরণ ও সংস্কারে সারওয়ার আলমের সাম্প্রতিক উদ্যোগের পরপরই এই বদলির আদেশ আসায় সাধারণ মানুষ যে দুটি ঘটনাকে সম্পর্কিত করার চেষ্টা করছে, সে বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সাধারণ মানুষ বা কোনো গোষ্ঠী যদি নিজের মতো করে দুটি ভিন্ন ঘটনাকে এভাবে মেলায়, তবে তো হবে না। মাজারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয়ের সঙ্গে সরকারের এই বদলি আদেশের কী সম্পর্ক থাকতে পারে? বদলি তো একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, এটি যেকোনো সময় যেকোনো কর্মকর্তার ক্ষেত্রে হতেই পারে। এর সঙ্গে অন্য কোনো স্থানীয় অনভিপ্রেত ঘটনা মেলানোর কোনো কারণ বা ভিত্তি নেই।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বদলি নিয়ে চলমান তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের জবাবে প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সরকারের নীতিগত অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘এটি সরকারের একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং রুটিন প্রক্রিয়া। কোনো সরকারি কর্মকর্তা কোনো নির্দিষ্ট পদে বা অঞ্চলে স্থায়ী নন। তিনি একটি কর্মস্থলে আসবেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী তার দায়িত্ব ও কাজ করবেন এবং সময় শেষে আবার অন্যত্র চলে যাবেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো ব্যক্তিই কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় অপরিহার্য নন। একজন কর্মকর্তা যদি তার কর্মস্থলে ভালো কাজ করেন, তবে স্থানীয় মানুষ তাকে পছন্দ করবে, ভালোবাসবে—সেটাই খুব স্বাভাবিক এবং কাম্য। বস্তুত, একজন সরকারি কর্মকর্তার প্রধান দায়িত্বই হলো সততা ও নিষ্ঠার সাথে জনগণের কল্যাণে ভালো কাজ করা।’
বদলি আদেশের প্রজ্ঞাপনে সারওয়ার আলমকে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন কোনো পদে পদায়ন না করে কেবল মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রতিমন্ত্রী এর প্রশাসনিক নিয়মটি পরিষ্কার করেন। তিনি জানান, ‘প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, যাদের কোনো নির্দিষ্ট জেলা বা দপ্তর থেকে তুলে আনা হয়, তাদের প্রথমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এটি একটি নিয়মিত দাপ্তরিক ধাপ। এরপর তাদের যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা বিবেচনা করে নতুন পদে পদায়ন করা হয়। সারওয়ার আলমকেও একইভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আনা হয়েছে এবং এখান থেকে খুব শীঘ্রই তাকে নতুন পদে পদায়ন করা হবে।’
উল্লেখ্য, মো. সারওয়ার আলম ২৭তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের একজন অত্যন্ত সুপরিচিত ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তিনি যখন সিনিয়র সহকারী সচিব পদে কর্মরত ছিলেন, তখন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দেশজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি দেশব্যাপী তিন শতাধিক সফল ভেজালবিরোধী ও দুর্নীতিবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। খাদ্যে ভেজাল, ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান, ভুয়া চিকিৎসক ও হাসপাতালের অনিয়ম এবং বিভিন্ন করপোরেট খাতের অনিয়মের বিরুদ্ধে তার কঠোর ও আপসহীন অভিযান পরিচালনা তাকে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রশংসিত ও আলোচিত ব্যক্তিতে পরিণত করেছিল।