গাজী জহিরুল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে যে রাজনৈতিক সংগঠনের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে, সেটি হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়; বরং বাঙালি জাতির অধিকার আদায়, স্বাধিকার আন্দোলন, ভাষা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ পথচলার অন্যতম প্রধান নেতৃত্বদানকারী শক্তি।
আজ প্রতিষ্ঠার ৭৭ বছর অতিক্রম করে দলটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করছে। এই দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগ যেমন গৌরব ও সাফল্যের সাক্ষী হয়েছে, তেমনি বহন করেছে অসংখ্য ত্যাগ, নির্যাতন, আত্মদান এবং সংগ্রামের ইতিহাস।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও পূর্ব বাংলার জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার দ্রুত উপেক্ষিত হতে থাকে। রাষ্ট্রক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর হাতে। বৈষম্য, বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে ক্রমেই অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শামসুল হক। পরবর্তীকালে দলটি অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে “মুসলিম” শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নামে আত্মপ্রকাশ করে।
বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিপ্রস্তর। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ শুধু ভাষার অধিকারই প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেছে।
যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও গণমানুষের বিজয়
১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে আওয়ামী লীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি ছিল পূর্ব বাংলার জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার রূপরেখা। নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি এবং যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয় প্রমাণ করে যে জনগণ বৈষম্যমূলক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি বাঙালির স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। ছয় দফা ছিল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বাধিকারের সুস্পষ্ট রূপরেখা, যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতার আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ছয় দফাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিলেও পূর্ব বাংলার জনগণ এটিকে নিজেদের মুক্তির সনদ হিসেবে গ্রহণ করে।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানি শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার এবং শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি লাভ করেন। এ সময়ই তিনি “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত হন।
১৯৭০-এর নির্বাচন ও স্বাধীনতার পথে যাত্রা
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল মেনে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রস্তুতির আহ্বান জানায়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার পর শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় প্রবাসী মুজিবনগর সরকার, যা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান এবং দুই লাখেরও বেশি মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। এই সংগ্রামে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ জনগণ সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করেন।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্ব গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়।
পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির উত্থানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সংগ্রাম চালিয়ে যায়।
আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ আন্দোলনের ফলেই দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
উন্নয়ন, অগ্রগতি ও আধুনিক বাংলাদেশের যাত্রা
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ উন্নয়নমুখী রাজনীতির ধারাও প্রতিষ্ঠা করেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের অগ্রগতিতে দলটির অবদান আলোচিত।
বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক সূচক এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে গৃহীত উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
আওয়ামী লীগের ৭৭ বছরের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ইতিহাস নয়; এটি ভাষা শহীদ, মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ, গণতন্ত্রের জন্য আত্মদানকারী নেতাকর্মী এবং গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ইতিহাস।
এই দীর্ঘ পথচলায় দলটি অসংখ্য সংকট, ষড়যন্ত্র, দমন-পীড়ন ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছে। তবুও স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে।
৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জন্মবার্ষিকী নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও জাতীয় অগ্রযাত্রার ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় ভাষা আন্দোলনের শহীদদের, মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এবং গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মত্যাগকারী সকল নেতাকর্মীকে।
গৌরবময় ইতিহাস, সংগ্রামের ঐতিহ্য এবং স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার ৭৭ বছরের পথচলা অতিক্রম করেছে। একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে দলটির পথচলা অব্যাহত থাকুক— প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই প্রত্যাশা।