খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
নারী ক্রিকেটারদের মাতৃত্বকালীন বিরতির পর নিরাপদ, পরিকল্পিত ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে মাঠে ফেরার সুযোগ করে দিতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ‘রিটার্ন টু প্লে পোস্ট-প্রেগন্যান্সি গাইডলাইন’। এই নির্দেশিকাটি মূলত মা হওয়ার পর নারী ক্রিকেটারদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রেখে ধাপে ধাপে আবার প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরিয়ে আনার একটি বৈজ্ঞানিক ও মানবিক রোডম্যাপ।
বর্তমান যুগে নারী ক্রিকেট দ্রুত পেশাদারিত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক ক্রিকেটারই এখন তাদের খেলোয়াড়ি জীবনের মাঝপথে পরিবার গঠনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অতীতে সন্তান জন্মদানের পর অনেক ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার অকালেই থমকে যেত। আইসিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, মাতৃত্ব যেন কোনোভাবেই একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের সমাপ্তি না ঘটায়, সেটি নিশ্চিত করতেই এই আধুনিক নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে।
নারী ক্রিকেটের স্বাস্থ্য, সামগ্রিক কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে আইসিসি তাদের অন্যতম প্রধান কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে। ‘১০০% ক্রিকেট’ উদ্যোগের আওতায় সংস্থাটি বেশ কিছুদিন ধরেই নারী ক্রিকেটারদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় তৈরি এই নতুন নির্দেশিকায় ক্রিকেটে ফেরার জন্য ‘৬ আর’ (6 Rs) নামের একটি বিশেষ ধাপভিত্তিক মডেল প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ছয়টি ধাপ হলো:
রেডি (Ready): সন্তান প্রসবের পর প্রাথমিক ধাপে শরীরকে বিশ্রামের মাধ্যমে প্রস্তুত করা।
রিভিউ (Review): বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে শারীরিক অবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা ও মূল্যায়ন।
রিস্টোর (Restore): হালকা ব্যায়াম ও থেরাপির মাধ্যমে শরীরের অভ্যন্তরীণ শক্তি পুনরুদ্ধার করা।
রিকন্ডিশন (Recondition): ক্রিকেটের উপযোগী ফিটনেস ও স্ট্যামিনা ফিরে পাওয়ার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ।
রিটার্ন (Return): সম্পূর্ণ ফিটনেস অর্জনের পর পুনরায় প্রতিযোগিতামূলক ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন।
রিফাইন (Refine): মাঠে ফেরার পর পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সূচিতে পরিবর্তন আনা।
আইসিসির মেডিকেল অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য এবং অস্ট্রেলিয়া নারী ক্রিকেট দলের প্রধান চিকিৎসক ডা. ফিলিপা ইনজের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল এই নির্দেশিকাটি প্রণয়ন করেছেন। এতে কেবল মাঠের ফিটনেস নয়, বরং একজন নতুন মায়ের বাস্তব চাহিদার দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নমনীয় অনুশীলনের পরিবেশ, শিশুর যত্ন ও লালন-পালন সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, খেলা চলাকালীন ভেন্যুতে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো বা দেখভালের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং সফরের সময় মা ও শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় ভ্রমণ সহায়তার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলো।
ডা. ফিলিপা ইনজে বলেন, সন্তান জন্ম দেওয়া মানেই কোনো নারী অ্যাথলেটের ক্যারিয়ারের ইতি ঘটে যাওয়া নয়—এই ইতিবাচক বার্তাই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে চায় আইসিসি। বিভিন্ন দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা ও ক্রিকেট বোর্ডের সক্ষমতা অনুযায়ী এই নির্দেশিকাটি কাজে লাগানো যাবে। প্রতিটি দেশের ক্রিকেট বোর্ডের উচিত তাদের খেলোয়াড় ও তার পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ পাশে দাঁড়ানো।
আইসিসির এই মানবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের অভিজ্ঞ লেগ-স্পিনার আফি ফ্লেচার। ২০২১ সালে মা হওয়ার পর তিনি সফলভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কামব্যাক করেছেন এবং বর্তমানে আইসিসি নারী ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মঞ্চে খেলছেন। নিজের কঠিন লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে ফ্লেচার বলেন, সন্তান প্রসবের পর শারীরিকভাবে ফিট হওয়া যতটা না কঠিন ছিল, তার চেয়ে শতগুণ বেশি কঠিন ছিল ছোট্ট সন্তানকে ঘরে রেখে মাঠে ফেরা। মানসিকভাবে সেই শূন্যতা কাটানো সহজ ছিল না। তবে আইসিসির এই নতুন গাইডলাইন অন্য মায়েদের জন্য পথটি অনেক সহজ করে দেবে। এটি খেলোয়াড়দের পরিবার গঠন ও দেশের হয়ে খেলা—দুইয়ের মধ্যে চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহ এই নির্দেশিকার গুরুত্ব তুলে ধরে জানান, নারী ক্রিকেটের টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য খেলোয়াড়দের জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পাশে থাকা জরুরি। কোনো নারী ক্রিকেটারকে যেন মাতৃত্ব অথবা দেশের প্রতিনিধিত্ব করার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হতে না হয়, সেটিই আইসিসির মূল লক্ষ্য। এই গাইডলাইন বিশ্বজুড়ে নারী ক্রিকেটারদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বৈষম্যহীন পরিবেশ গড়ে তুলবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেয়েদেরও ক্রিকেটে আসতে অনুপ্রাণিত করবে।