জাহিদ জগৎ
প্রকাশ: রবিবার, ৩০ মার্চ ২০২৫
শিশু ও সভ্যতা
ওরা বলে ড্যান্ডিখোর, মারা জায়েজ আছে
কেউ কেউ পথশিশু বলে পাত্তাই দেয় না
বাকি যারা ভালোবাসার কথা বলে তারাও এসে
দুটো বই ধরিয়ে দিতে চায় হাতে
কেউ কেউ বলে সভ্য হয়ে এসো
পৃথিবীতে এমন কী সভ্যতা আছে,
যেইখানে সব মানুষ ঠাঁই পায় নির্বিশেষে?
এইখানে মধ্যরাতের পরে
রাস্তা কথা কয় গভীর আঁধার হতে
এইখানে কথা কয় ভোরের বাতাস
নিশ্বাসে ঝড় ওঠে ফুটপাতে,
কে শোনে সভ্যদের দেশে
কে শোনে দিনভারী কুকুর কাকে ডাকে শেষ রাতে
কে দেখে আলো গভীর অন্ধ চোখে।
শোনে না ভাই, যার কিছু নাই
তারও আছে তেমন, সকলের যা কাছে
পৃথিবীর পরে সকলেই মরে
উড়ে যাওয়া শালিকের মতো,
অন্ধ প্যাঁচার মতো, শিয়াল-শকুনের মতো
নতুন চকচকে গাড়ির মতো
তোমাদের শিক্ষা তোমাদের আকাঙ্ক্ষা
তোমাদের ইচ্ছা এবং তোমাদের মৃত্যু
কবে কোথায় হয়েছ পৃথক, সভ্যতার ভারে?
যারা ডাকে আত্ম-অহংকারে
আর যারা ডাকে না,
তারাও থাকে পৃথিবীর আকাশজুড়ে।
মানুষ
মানুষ—
তোমাকে জেনেছি প্রাচীন ছায়া
তোমার আঙুলে বাঁধা ঘূর্ণনের দড়ি
মৃত্তিকার ঠোঁটের প্রথম চুম্বন, তোমাকে ডেকেছি মা
মানুষ, তুমি গর্ভে লুকিয়ে রেখেছ আততায়ী
আমি যাকে ধরতে পারি নিকাশের বিস্তারে
মানুষ
তোমাকে ভালোবেসে হারিয়েছি প্রিয়তমা, যার বুক রেহেলে ঢাকা
বুকে খোদাই করে লিখে রাখা ছিল ভবিষ্যৎ
গণনায় শূন্য গণিতের ব্যর্থতম দিবস হিসেবে
মানুষ,
তোমাকে হারিয়েছি এক অসহায় বিদীর্ণ মধ্যরাতে।
শীত ও ফুটপাতের গল্প
এইডা ফুটপাত মিয়া ভাই, এইখানে শীত একটা অভিশাপ
পাপ তো ব্যাকেই করে, ব্যাকেই কি আর গঙ্গা চরে!
ধরে শুধু হাড়-কঙ্কালে।
এই যে শীত! শীত শীত খেলা, বাড়ি পালানো সন্ধ্যাবেলা
ল্যাপের মইধ্যে, কম্বলের মইধ্যে
ঘষাঘষি, খসাখসি, বালিশ লইয়া তাপের স্বপন
শ্যাষ রাইতের ভাঙনদোষে আত্মলেহন
সবই আপনাগো সুসংবাদ।
টিভি-টুভি-খবরওয়ালা, সবাই আপনাগো রানের যত্নে,
ঠোঁটের যত্নে, ভাতারবিহীন চ্যাটের যত্নে
খালি গরম আর গরম বিলায়া যায়—
আপনারা গরম হইতে হইতে ভিইজ্যা পানি অইয়া যান,
এই শীতের রাইতে, এই শীতের রাইতে
হেই পানি লাগে আমাগো গায়, মধ্যরাইতের
ঝড়ের মতন, বিরাট দুই ডানাঅলা চিলের মতন
খাবলায় বুক, সুই ফোটায়
হাড়ে-হাড্ডিতে কম্পন ওঠে, বুকের বাচ্চা খইসা পড়ে
পাত্তরে, মাটি নাই কোথাও
এই শহরে মাটি পাইবেন কই, আমার বুক ছাড়া?
সবহারারও যে জীবন আছে, এইডা আপনারা জানবেন কেমনে?
কেমনে জানবেন, জীবন কোথায় জীবনহারা?
সর্বনাশের ব্যাবাক রাইতেই উড়ায়া নেয় শীতের বাও
কেউ জানে না, লাঙ্গের আশায়—সাঙ্গের আশায় না
খালি ইট্টু ওমের আশায়
বুকের মইধ্যে চাইপ্যা ধইরা মাইরা ফেলছি কোলের ছাও।
ধরো
আমারে ধরো আমি দুর্বল
হাতে-পায়ে ধরা নয়
এই ধরা তুমি বোঝো।
বোঝার মতো ভারী, হৃদয়;
দেখো সে-ও এক গ্রাম
গ্রাম মানেই কি পাখি?
তেমন জরুরি নয় কিন্তু; তবু
কান পাতা যেতে পারে ভেতরে
এমনকি বাহিরে বোতাম খোলা
অথবা পুরাতন সেলাইয়ের ফোকর
ভরাট রেখেও দেখা যেতে পারে
কোথাও কাকলি লুকিয়ে আছে কি না।
দেখতে চোখ দরকার, আদতে দরকার কি!
এতবার লিখি, আঁকি, দাগাই, জাগাই
মনে মনে; মনে হয় ভালোবাসি,
হয়ে গেলে বিপদ কি না কে জানে
যারা জানে খুঁজলে নিশ্চয়ই জানা যেত।
আবার খোঁজো, চিরকাল এই স্বতঃস্ফূর্ত উপাসনা
উপলব্ধির পর ক্লান্ত লাগে, তীব্র আহত
আমারে ধরো, হাতে-পায়ে ধরা নয়
হৃদয়, পাখি-পাথর সবকিছু ছাড়িয়ে
সে এক প্রবল গ্রাম, শীতকাতর, নরম।
প্রেমিকা
যারা খুনি তারা হাত তুলুন
আর যারা আমার মতো শুয়ে আছেন—
মেরুদণ্ডহীন পাথরের মতো, তারা চোখ খুলুন,
দেখুন কীভাবে মায়া সভ্যতায় মানুষ এঁকেছে বন্য হরিণের চিত্র
আমরা গুটিয়ে নিয়েছি সময়ের দ্বারকানাথ-আনন্দ বাজার কিংবা প্রথম আলো
জীবনের পরিসীমায় আমাদের বিকৃত রূপ এঁকে যাচ্ছে,
তুমি অন্ধ কিংবা কেবলই বিনোদনপ্রিয় বিড়ালছানা, দেখো নাই কীভাবে ওরা
শুয়োরের বাচ্চার মতো মুসলমান বানিয়ে দিয়েছে আমাকে
আর আমার মুণ্ডুতে দশটা মাথা লাগিয়ে, তার ওপর আতশবাজি ফোটাচ্ছে পূজার সংখ্যা
তুমি আমার মাথা খাবে আর আমি তোমার—মাটির শরীর ভেদ করে
আমরা পরস্পর পরস্পরের যোনি কিংবা মগজ কিছুই ছুঁতে পারব না কোনো দিন
কেবল দুঃখের জীবন কাটিয়ে দেব বটবৃক্ষের ছায়ায়—
ক্লান্ত অথচ প্রশ্নের মুখে দাঁড়াব জন্মজন্মান্তরে,
যে কার্ল মার্ক্স কোনোকালেই ছিল না আমাদের সাথে— যেখানে জীবন মানে শুধুই জীবন
যেখানে, আরও বেশি মূল্যমান ও প্যাকেটজাত হয়েছে আমাদের শিশু
মায়েরা—লুকিয়ে রেখেছে বুকের দুধ
আর পিতার কাধে ক্লান্তিকর বিপ্লব
হতাশায় আত্মহত্যা করেছে আমাদের বোন—আমাদের নারীরা চেয়েছে যেন শাড়ি খুলে রাস্তায় নামা যায়
রাস্তা কেবলই বেদখলে কাতরে মরেছে—কানাগলি জ্যাম আর উন্নয়ন প্রকল্পে
আমি তোমাকে ডেকেছি—খুন হোয়ো না, প্রিয়তমা
তোমার জন্য এখনো একটা বুক জেগে আছে পথের ’পরে।