উদয় হাসান
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ মার্চ ২০২৫
সেকেন্ড রিপাবলিক আইডিয়াটা সমস্যাজনক। প্রাথমিকভাবে আমরা যেখানে আলাপ করছি, একাত্তরে বাংলাদেশে আসলে কোনো রাষ্ট্রই গঠিত হয়নি। রাষ্ট্র ‘গঠন’ করা বলতে বোঝায় স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের নতুন গণপরিষদ নির্বাচন, গঠনতন্ত্র (Constitution) প্রণয়ন এবং গণভোটের মাধ্যমে তা গ্রহণ। একাত্তরে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি বটে, কিন্তু রাষ্ট্র গঠন করতে পারিনি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণের কাছে সেই গাঠনিক মুহূর্ত (constituent moment) আবার হাজির হয়েছিল যে সে নিজের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে রাষ্ট্রের রূপ দেবে—গণসার্বভৌমত্ব কায়েম করবে। সেখানে সেকেন্ড রিপাবলিক বা দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র একটা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া করপোরেট এনডর্সড লুটেরা-মাফিয়াগোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা-আপসের সোশ্যাল কনট্রাক্টারিয়ান ধারণা, এটা তর্কটাকে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বা পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বের দিকে নিয়ে চলে যাচ্ছে। অথচ আমরা বলছি রাষ্ট্র বা সংসদ নয়, জনগণই সার্বভৌম এবং সার্বভৌম জনগণই কেবল পারে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে গঠন করতে।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, সেকেন্ড রিপাবলিক হলো এলিট শ্রেণির ভাষা বা রাজনৈতিক বর্গ। ১৮৪৮ সালে ফ্রান্সে লুই বোনাপার্টের একনায়কত্বের পথ তৈরি করে দিয়েছিল দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র, সেখানে সায় দিয়েছিল ব্যাংকমালিক ও ধনিক মুৎসুদ্দি শ্রেণি। মার্ক্স তাঁর লুই বোনাপার্টের আঠারোই ব্রুমেয়ার লেখায় এ নিয়ে বিস্তারিত বলেছেন, কীভাবে তাদের ’৪৮-এর বিপ্লবের ফসল বুর্জোয়া শ্রেণি দখল করে নিয়েছিল। বিশ্বের ইতিহাসে বারবার এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র একটা গণতন্ত্রবিরোধী এবং গণ-অভ্যুত্থানবিরোধী আইডিয়া। ইতিহাস আমাদের শেখায় কীভাবে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রায় ক্ষেত্রেই সামরিক শাসন, কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসন কিংবা অভিজাত ও লুটেরা-মাফিয়া শ্রেণির সঙ্গে লিয়াজোঁর মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হয়। এটা প্রায় গণ-অভ্যুত্থানকে হত্যার শামিল।
রিপাবলিক একটা গণতন্ত্রবিরোধী আইডিয়া, এর অভিমুখ রাষ্ট্র কিংবা পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বের দিকেই। আর আমরা বলি : গণসার্বভৌমত্ব কায়েম করাই গণতন্ত্রের সত্য, যেটা আবার বুর্জোয়া ব্যক্তির ঐতিহাসিক বিকাশের বাইরের কিছু নয়। আমাদের আলাপের প্রাথমিক পজিশন হলো গণতন্ত্র একটা জীর্ণ রাজনৈতিক বর্গ, তবে এটা বলার পরও আধুনিক পলিটিক্যাল থিওরিতে কীভাবে তথাকথিত সাম্রাজ্যবাদী ঈগলমার্কা গণতন্ত্রের বাইরে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং উপনিবেশবাদবিরোধী লড়াইয়ে গ্লোবালি তত্ত্ব এবং সংগ্রামের জায়গা থেকে নতুন র্যাডিকেল গণতন্ত্রের ধারণা বিকশিত হচ্ছে, আমরা সেদিকে নজর দিই : গাঠনিক ক্ষমতা আকারে গণসার্বভৌমত্ব কায়েমের ধারণা (Constituent Power as Popular Sovereignty) সে ক্ষেত্রে আমাদের গণতন্ত্রকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়ন করতে সাহায্য করে।
সার্বভৌমত্বের ধারণাটা আমরা খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্ব থেকে পেয়েছি—যেখানে ঈশ্বরের সার্বভৌমত্বই রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত হয়েছে। তাই আমরা বলি, আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্র আসলে খ্রিষ্টীয় ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্র। ঈশ্বর থেকে গির্জা হয়ে রাজার সার্বভৌমত্বই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক আর দার্শনিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাব, সার্বভৌম ক্ষমতার দুই রকমের অর্থ পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে : একটা সর্বোচ্চ আইন আকারে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব (Sovereignty as Supreme Command), আরেকটা গাঠনিক ক্ষমতা আকারে গণসার্বভৌমত্ব (Sovereignty as Constituent Power)। তবে পরবর্তী সময়ে গণসার্বভৌমত্বের ধারণাটি ফরাসি এবং মার্কিন বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর চাপা পড়ে যায় এবং জাতিরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয়, যার নানা উকিলি-দার্শনিক কারণ আমরা আন্দ্রেয়াস ক্যালিভাস পড়লে জানি। সেদিকে না যাই। আজকের কাছাখোলা বাজারের বিশ্বব্যবস্থায় (neoliberal world order) পুরাতন জাতিরাষ্ট্র কিংবা সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণা ভেঙে পড়েছে; বৈশ্বিক পুঁজির পুঞ্জীভবন ও স্ফীতির স্থানীয় এজেন্টের ভূমিকা পালন করা ছাড়া রাষ্ট্রের কোনো রোল নেই। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়, এই কাছাখোলা বাজারতন্ত্রের মতাদর্শই হলো গণতন্ত্র। বৈশ্বিক লড়াইয়ের মর্মশাঁস যখন আমাদের সামনে হাজির হয়েছে ‘মানুষ ও তার প্রাণপ্রকৃতির আবাস-গ্রহ বনাম পুঁজি’ এই মর্মে, তখন এই লড়াইয়ের নিরিখে গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্রের মতো জীর্ণ বর্গগুলোকে নিয়ে আমাদের পুনরায় ভাববার অবকাশ তৈরি হয়েছে। গণের সার্বভৌমত্ব কায়েমের লড়াই দিন শেষে পুঁজির সার্বভৌমত্বের বিপরীতে মানুষের পৃথিবীর ইতিহাসে কর্তা হয়ে ওঠার লড়াইও বটে। অবশেষে কেন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের নামে বৈশ্বিক পুঁজির আল্লাগিরির সাথে গণের সার্বভৌমত্ব সাংঘর্ষিক—এই গোমর ফাঁস হতে শুরু করে।
যেখানে আমরা গণতন্ত্র বা demos-kratos-এর আক্ষরিক অনুবাদ করি গণক্ষমতা। গণতন্ত্র সেখানে হয়ে উঠছে গণক্ষমতার পরিগঠন এবং বিজয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই ক্ষমতাকে গাঠনিক ক্ষমতায় রূপ দেওয়া বা গণসার্বভৌমত্ব কায়েম করা। ইন্সার্জেন্সি এবং গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কীভাবে এই গণতন্ত্র কায়েম হয়, আবার ঐতিহাসিকভাবে রাষ্ট্র বা জনগোষ্ঠী গঠিত হয়, তা নিয়ে সারা বিশ্বে নতুনভাবে ভাববার চেষ্টা হচ্ছে—লাতিন আমেরিকা, উত্তর আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্য প্রমুখ ফ্রন্টে তৃতীয় বিশ্বের গণমানুষের লড়াই কী রূপ নিচ্ছে, সেটা বিচার হচ্ছে। আমাদের উচিত হবে জুলাইয়ের ওয়াস্তে নিজেদের রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত করা।
গণকে আসলে বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গঠিত হতে হয়। জনগণ কোনো গাণিতিক বর্গ নয়, বরং এটা একটা রাজনৈতিক বর্গ, যা ভূতাপেক্ষা (apriori) হাজির থাকে না। এই গণশক্তি পরিগঠনের প্রক্রিয়াকেই আমরা বলছি ‘চিন্তার দ্বন্দ্ব মীমাংসা ও মোকাবিলা করে’ এগোনো। জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় তো আসমান থেকে নাজিল হবার মতো কিছু নয়; তাকে তার মাটিতেই, তার ঐতিহাসিকতার ভেতরই হাজির হতে হয়। এই হাজিরানার ফ্যাসিলিটেটর আপনি-আমি—আমরা যারা মার্ক্সের ভাষায় সমাজের ‘সবচেয়ে অগ্রবর্তী ও দৃঢ়চিত্ত (সংবেদনশীল) অংশ, সেই অংশ, যারা সবাইকে সামনে ঢেলে এগিয়ে নিয়ে যায়।’ মানে যারা ভ্যানগার্ড, অগ্রসৈনিক।
মার্ক্সের মতে, তত্ত্বগত স্পষ্টতা বিপ্লবীদের প্রধান হাতিয়ার এবং সমাজে উপস্থিত চিন্তার দ্বন্দ্বগুলোকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সমাধান করাই এই প্রক্রিয়ার অন্তর্গত। মার্ক্সের কাছ থেকে এই শিক্ষাটা আমরা নিতে পারি। আবার লেনিনের রাজনৈতিক মডেলটা হচ্ছে বৈপ্লবিক রূপান্তরের জন্য অবশ্যই বিপ্লবীদের সংগঠিত রাজনৈতিক দল লাগবে, তবে তত্ত্বকে হতে হবে এই দলের ভরকেন্দ্র : ‘বৈপ্লবিক তত্ত্ব ছাড়া বৈপ্লবিক আন্দোলন হতে পারে না।’ এর জন্য বিপ্লবীদের একটা পত্রিকা থাকাটাকে লেনিন গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছেন, রাজনৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি এই পত্রিকাকে ঘিরে সংগঠিত হওয়াটাই ‘অপরিমেয়ভাবে বিস্তৃততর এবং অধিকতর বিবিধ সাধারণভাবে সমস্ত বৈপ্লবিক ক্রিয়াকলাপের’ অংশ। এখানে আমরা লেনিনের ইস্ক্রার প্রতি গুরুত্ব বুঝতে পারি। আগামী আসন্ন লড়াইয়ের রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই, চিন্তার দ্বন্দ্ব মীমাংসা ও মোকাবিলা করেই আমাদের এগোতে হবে।