বুধবার, ২৯ই এপ্রিল ২০২৬, ১৬শে বৈশাখ ১৪৩৩
বুধবার, ২৯ই এপ্রিল ২০২৬, ১৬শে বৈশাখ ১৪৩৩
ব্রেকিং নিউজ :
টানা বৃষ্টিতে দেশের চার নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়াল, পাঁচ জেলায় বন্যা সতর্কতা সুবর্ণচরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু: বজ্রপাত নয়, আত্মহত্যা বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে জাতিসংঘে ১৭৩ আইনজীবীর আবেদন যাত্রী সেজে কাস্টমস কর্মকর্তাকে হত্যা, গ্রেপ্তার ৫ ইরান চাইলে আলোচনা করতে পারে: দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের নতুন বার্তা শাহবাগে সাংবাদিক আহত ঘটনায় তদন্তে ছাত্রদল কমিটি বগুড়ায় বিএনপি নেত্রীর প্রক্সি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে কলেজছাত্রী আটক হরমুজে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করাতে ওমান উপকূলে জাহাজে ইরানি বাহিনীর হামলা ভোলায় নদীপথে চার হাজার দুইশ লিটার পেট্রোল জব্দ কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা টানা বৃষ্টিতে দেশের চার নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়াল, পাঁচ জেলায় বন্যা সতর্কতা সুবর্ণচরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু: বজ্রপাত নয়, আত্মহত্যা বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে জাতিসংঘে ১৭৩ আইনজীবীর আবেদন যাত্রী সেজে কাস্টমস কর্মকর্তাকে হত্যা, গ্রেপ্তার ৫ ইরান চাইলে আলোচনা করতে পারে: দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের নতুন বার্তা শাহবাগে সাংবাদিক আহত ঘটনায় তদন্তে ছাত্রদল কমিটি বগুড়ায় বিএনপি নেত্রীর প্রক্সি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে কলেজছাত্রী আটক হরমুজে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করাতে ওমান উপকূলে জাহাজে ইরানি বাহিনীর হামলা ভোলায় নদীপথে চার হাজার দুইশ লিটার পেট্রোল জব্দ কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা টানা বৃষ্টিতে দেশের চার নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়াল, পাঁচ জেলায় বন্যা সতর্কতা সুবর্ণচরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু: বজ্রপাত নয়, আত্মহত্যা বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে জাতিসংঘে ১৭৩ আইনজীবীর আবেদন যাত্রী সেজে কাস্টমস কর্মকর্তাকে হত্যা, গ্রেপ্তার ৫ ইরান চাইলে আলোচনা করতে পারে: দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের নতুন বার্তা শাহবাগে সাংবাদিক আহত ঘটনায় তদন্তে ছাত্রদল কমিটি বগুড়ায় বিএনপি নেত্রীর প্রক্সি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে কলেজছাত্রী আটক হরমুজে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করাতে ওমান উপকূলে জাহাজে ইরানি বাহিনীর হামলা ভোলায় নদীপথে চার হাজার দুইশ লিটার পেট্রোল জব্দ কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা টানা বৃষ্টিতে দেশের চার নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়াল, পাঁচ জেলায় বন্যা সতর্কতা সুবর্ণচরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু: বজ্রপাত নয়, আত্মহত্যা বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে জাতিসংঘে ১৭৩ আইনজীবীর আবেদন যাত্রী সেজে কাস্টমস কর্মকর্তাকে হত্যা, গ্রেপ্তার ৫ ইরান চাইলে আলোচনা করতে পারে: দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের নতুন বার্তা শাহবাগে সাংবাদিক আহত ঘটনায় তদন্তে ছাত্রদল কমিটি বগুড়ায় বিএনপি নেত্রীর প্রক্সি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে কলেজছাত্রী আটক হরমুজে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করাতে ওমান উপকূলে জাহাজে ইরানি বাহিনীর হামলা ভোলায় নদীপথে চার হাজার দুইশ লিটার পেট্রোল জব্দ কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা টানা বৃষ্টিতে দেশের চার নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়াল, পাঁচ জেলায় বন্যা সতর্কতা সুবর্ণচরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু: বজ্রপাত নয়, আত্মহত্যা বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে জাতিসংঘে ১৭৩ আইনজীবীর আবেদন যাত্রী সেজে কাস্টমস কর্মকর্তাকে হত্যা, গ্রেপ্তার ৫ ইরান চাইলে আলোচনা করতে পারে: দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের নতুন বার্তা শাহবাগে সাংবাদিক আহত ঘটনায় তদন্তে ছাত্রদল কমিটি বগুড়ায় বিএনপি নেত্রীর প্রক্সি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে কলেজছাত্রী আটক হরমুজে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করাতে ওমান উপকূলে জাহাজে ইরানি বাহিনীর হামলা ভোলায় নদীপথে চার হাজার দুইশ লিটার পেট্রোল জব্দ কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা টানা বৃষ্টিতে দেশের চার নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়াল, পাঁচ জেলায় বন্যা সতর্কতা সুবর্ণচরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু: বজ্রপাত নয়, আত্মহত্যা বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে জাতিসংঘে ১৭৩ আইনজীবীর আবেদন যাত্রী সেজে কাস্টমস কর্মকর্তাকে হত্যা, গ্রেপ্তার ৫ ইরান চাইলে আলোচনা করতে পারে: দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের নতুন বার্তা শাহবাগে সাংবাদিক আহত ঘটনায় তদন্তে ছাত্রদল কমিটি বগুড়ায় বিএনপি নেত্রীর প্রক্সি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে কলেজছাত্রী আটক হরমুজে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করাতে ওমান উপকূলে জাহাজে ইরানি বাহিনীর হামলা ভোলায় নদীপথে চার হাজার দুইশ লিটার পেট্রোল জব্দ কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা টানা বৃষ্টিতে দেশের চার নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়াল, পাঁচ জেলায় বন্যা সতর্কতা সুবর্ণচরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু: বজ্রপাত নয়, আত্মহত্যা বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে জাতিসংঘে ১৭৩ আইনজীবীর আবেদন যাত্রী সেজে কাস্টমস কর্মকর্তাকে হত্যা, গ্রেপ্তার ৫ ইরান চাইলে আলোচনা করতে পারে: দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের নতুন বার্তা শাহবাগে সাংবাদিক আহত ঘটনায় তদন্তে ছাত্রদল কমিটি বগুড়ায় বিএনপি নেত্রীর প্রক্সি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে কলেজছাত্রী আটক হরমুজে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করাতে ওমান উপকূলে জাহাজে ইরানি বাহিনীর হামলা ভোলায় নদীপথে চার হাজার দুইশ লিটার পেট্রোল জব্দ কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা টানা বৃষ্টিতে দেশের চার নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়াল, পাঁচ জেলায় বন্যা সতর্কতা সুবর্ণচরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু: বজ্রপাত নয়, আত্মহত্যা বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে জাতিসংঘে ১৭৩ আইনজীবীর আবেদন যাত্রী সেজে কাস্টমস কর্মকর্তাকে হত্যা, গ্রেপ্তার ৫ ইরান চাইলে আলোচনা করতে পারে: দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের নতুন বার্তা শাহবাগে সাংবাদিক আহত ঘটনায় তদন্তে ছাত্রদল কমিটি বগুড়ায় বিএনপি নেত্রীর প্রক্সি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে কলেজছাত্রী আটক হরমুজে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করাতে ওমান উপকূলে জাহাজে ইরানি বাহিনীর হামলা ভোলায় নদীপথে চার হাজার দুইশ লিটার পেট্রোল জব্দ কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা টানা বৃষ্টিতে দেশের চার নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়াল, পাঁচ জেলায় বন্যা সতর্কতা সুবর্ণচরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু: বজ্রপাত নয়, আত্মহত্যা বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে জাতিসংঘে ১৭৩ আইনজীবীর আবেদন যাত্রী সেজে কাস্টমস কর্মকর্তাকে হত্যা, গ্রেপ্তার ৫ ইরান চাইলে আলোচনা করতে পারে: দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের নতুন বার্তা শাহবাগে সাংবাদিক আহত ঘটনায় তদন্তে ছাত্রদল কমিটি বগুড়ায় বিএনপি নেত্রীর প্রক্সি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে কলেজছাত্রী আটক হরমুজে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করাতে ওমান উপকূলে জাহাজে ইরানি বাহিনীর হামলা ভোলায় নদীপথে চার হাজার দুইশ লিটার পেট্রোল জব্দ কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা টানা বৃষ্টিতে দেশের চার নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়াল, পাঁচ জেলায় বন্যা সতর্কতা সুবর্ণচরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মৃত্যু: বজ্রপাত নয়, আত্মহত্যা বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে জাতিসংঘে ১৭৩ আইনজীবীর আবেদন যাত্রী সেজে কাস্টমস কর্মকর্তাকে হত্যা, গ্রেপ্তার ৫ ইরান চাইলে আলোচনা করতে পারে: দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের নতুন বার্তা শাহবাগে সাংবাদিক আহত ঘটনায় তদন্তে ছাত্রদল কমিটি বগুড়ায় বিএনপি নেত্রীর প্রক্সি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে কলেজছাত্রী আটক হরমুজে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করাতে ওমান উপকূলে জাহাজে ইরানি বাহিনীর হামলা ভোলায় নদীপথে চার হাজার দুইশ লিটার পেট্রোল জব্দ কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

ঈদ সংখ্যা ২০২৫

রাতের করতলে মাতাল চাঁদ

রাশেদ রহমান

প্রকাশ: সোমবার, ৩১ মার্চ ২০২৫

রাতের করতলে মাতাল চাঁদ
ছবি: খবরওয়ালা গ্রাফিক্স

হরিবোল। বোল হরি। হরিবোল…।

বুদ্ধপূর্ণিমার রাত। জোছনার ঢল নেমেছে চরাচরে। রাস্তায়, গাছের পাতায়, ঘরের চালে, ধানখেতে থই থই করছে জোছনা। ধানখেতকে সাগর বলে ভ্রম হয়। রাস্তাকে মনে হয় নদী। শবযাত্রা যেন মুখে হরিবোল ধ্বনি তুলে করতালের টুংটাং শব্দ গায়ে মেখে নদীর জল ভেঙে হাঁটছে। আমি দলের সবার পেছনে। ১৫-২০ জনের শবযাত্রা। রতন, দুলাল, বাদল, যতীশের কাঁধে সাবুদির লাশ। বাঁশ, লাকড়ি, পাটশোলা, ধূপ, কেরোসিনের টিন নিয়ে পাঁচ-ছয়জনের আরেকটি দল আগেই শ্মশানঘাটে পৌঁছে গেছে। শ্মশানঘাট বললাম বটে, এটি বলার জন্যই বলা; আসলে আমাদের গ্রামে পাকা ও স্থায়ী শ্মশানঘাট নাই। গাঁয়ের হিন্দু কেউ মারা গেলে কোনো কোনো বাড়ির লোকেরা, যাদের বড় বাড়ি কিংবা বাড়ির পাশে উঁচু পালান আছে, তারা বাড়ির উঠানে কিংবা পালানে চিতা সাজিয়ে মড়ার সৎকৃত্য করে। কিন্তু যাদের ছোট বাড়ি, ঘনবসতিপূর্ণ পাড়া, তারা বাড়িতে চিতা সাজাতে পারে না, সেই সুযোগ নাই, তাদের বাড়ির কোনো লোক মারা গেলে নদীর টোকে চিতা সাজিয়ে মড়া পোড়াতে হয়…। 

হিন্দুবাড়ির কেউ মারা গেছে, খাটিয়ায় লাশ, শবযাত্রায় বিশাল সমাবেশ, ভেঙে পড়েছে হিন্দুপাড়ার সব লোক, টোকে যাচ্ছে, শ্মশানবন্ধুদের মুখে হরিবোল ধ্বনি, খোল-করতালের মৃদুমন্দ টুংটাং আওয়াজ; রাতের বেলা হলে সেই রাত যদি হয় কৃষ্ণপক্ষের, পথে ঘুটঘুটে অন্ধকার; তবে কারও কারও হাতে মশাল, কারও হাতে হারিকেন; এই দৃশ্য আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে আসছিলাম। কিন্তু বড় হতে হতে দেখলাম—সবকিছু কেমন বদলে যাচ্ছে! গাঁয়ের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, বাজার, হাটখোলা, মসজিদ, মন্দির, পাঠশালা—সবকিছুতেই কত পরিবর্তন! নাতু শেখের বাড়িতে ছিল পাটখড়ির বেড়া, শণে ছাওয়া দুটো ঘর। শণ পচে পচে চালে গর্ত হতো, বৃষ্টির পানি পড়ত ঘরে, বিছানার কাঁথা-বালিশ সারের কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখত নাতুর বউ, ফি বছর চালে নতুন শণ লাগানোর সামর্থ্য ছিল না; সেই নাতু শেখের বাড়িতে তিন ভিটায় তিনটি টিনের ঘর চকচক করে। চাঁদনি রাতে দূর থেকে জোছনা-নৃত্য চোখে পড়ে টিনের চালে। নাতু শেখের বড় ছেলে কামাল দুবাই গেছে। বস্তায় বস্তায় টাকা আসে। তাতেই পরিবর্তন। মুরাদ মেম্বারের ছেলেও দুবাই গেছে। মেম্বারের বাড়িতে টিনশেড বিল্ডিং উঠছে। গাঁয়ের বাজার মধ্যরাত পর্যন্ত গমগম করে। মসজিদের মেঝেয়, দেয়ালে টাইলস বসেছে। পাঠশালার জরাজীর্ণ টিনের ঘর ভেঙে সরকার দোতলা বিল্ডিং করে দিয়েছে। এই সব পরিবর্তন, বড় বড় পরিবর্তন তো, সবই আমাদের চোখে পড়ে। ভেতরে-ভেতরেও কিছু পরিবর্তন ঘটে, ছোট ছোট পরিবর্তন হয়তো এগুলো, এই যেমন বলরাম সাহা, রাখাল সাহা, হরিলাল দাস, নিতাই পাল দুবছরের ব্যবধানে রাতের বেলা বাড়ির সব ঘরে তালা লাগিয়ে নিরুদ্দেশ হলো। শোনা গেল, তারা ইন্ডিয়ায় চলে গেছে। বলরাম সাহা আমাদের হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। আমি তখন সিক্সে পড়ি। স্যারের বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুল ছিল না। বুড়ো আঙুলও ব্যবহার না করে তিন আঙুল দিয়ে আমাদের গালে চড় মারতেন। একদিন ক্লাসে এসেই বললেন, এই, তোর নাম যেন কী? ও, সুমিত জহির, তুই তো ফাইভে বৃত্তি পেয়েছিস, স্কুলে রেজাল্ট এসেছে, আমি দেখে এলাম। আয়, তোকে একটু আদর করি। আমার চোখে তখন পানি এসে গেছে। স্যার আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আরে, পাগল ছেলে! কাঁদছিস কেন? এটা তো দারুণ খুশির খবর। রসুলপুর প্রাইমারি স্কুল থেকে তুই-ই প্রথম বৃত্তি পেলি। যা, এখনই বাড়ি যা। বাড়িতে খবর দিয়ে আয়…।

সাহারা ছিল জমিদারের মতো। কী বিশাল বাড়ি! দোতলা দালান। বাড়ির সামনে দিঘির মতো বৃহৎ পুকুর। পুকুর ঘেঁষে কালীমন্দির। তারা এই সব ফেলে রাতের বেলা চলে গেল! বলরাম স্যার জমিদারবাড়ির মানুষ হলেও তিনি ছিলেন অন্য রকমের। জমিদারি দেখতেন না। নতুন স্কুল তো, স্কুলটাকে কীভাবে গড়ে তোলা যায়, দাঁড় করানো যায়, এই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। জমিদারি দেখত রাখাল সাহা। সাহাবাড়ির মন্দিরটি ভেঙে পড়ছে। তবে মন্দিরটির ভাগ্য ভালো যে সাহাবাড়ির নতুন বাসিন্দা আলিমুদ্দিন ভূঁইয়া এটিকে ভেঙে ফেলেনি। পুকুর ও মন্দির দেবোত্তর সম্পত্তি, এই কারণে বোধ হয় ওরা বেঁচে গেছে। পুকুরের পানি গাঁয়ের হিন্দু-মুসলমান সবাই ব্যবহার করে…।

গাঁয়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা ঘটেছে নদীর টোকে। টোকের উত্তর পাশ দিয়ে পুবে-পশ্চিমে লম্বা একটা নতুন পাড়া বসে গেছে। নদীর পাড় ঘেঁষে সারি সারি ঘর। এই নতুন পাড়াটি যে বসল, হঠাৎ করে এক-দুই দিনে বসে গেল, নাকি ধীরে ধীরে, প্রথমে একটা-দুটো, তারপর পাঁচ-সাতটা, তারপর দশ-বারোটা করে শ খানেক কিংবা তারও বেশি—দেড় শ কি দুই শ বাড়ি হয়েছে; ছোট ছোট বাড়ি, শহরের বস্তির মতো; গাঁ উঠছে, উঠুক, তা উঠতেই পারে; কিন্তু আমি ভালো করে খেয়াল করিনি কিংবা খেয়াল করার মতো সময়ও ছিল না। তখন বড় হচ্ছি, লেখাপড়া ও খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত। একটু ফুরসত যদি মেলে, সহপাঠিনী সুষমা কি মনীষার শরীরের ঘ্রাণ নিতে ছুটে যাই। বয়সটা যেন তখন বেয়াড়া হয়ে উঠেছে। কথা শুনতেই চায় না…।

নদীর ওপারে, পাড় ঘেঁষে নতুন পাড়া বসেছে, বসুক, ক্ষতি কী? মানুষ বাড়ছে, পৃথক সংসার বাড়ছে, নতুন বাড়ি তো লাগবেই। জিন্নত মোল্লার দুই ছেলে কাশেম আর হাশেম নাকি নতুন পাড়ার পত্তন করেছে। তার পর থেকে পাড়ায় বাড়তে থাকে বাড়ি। নদীর পাড় ঘেঁষে যাদের জমি আছে, উঁচু জমি, মাটি ফেলে ভিটে তেমন টান করতে হয় না, অনেকেই নতুন পাড়ায় বাড়ি করে। বাড়ি করে, করুক; যার টোকপাড়ে জমি আছে, সে বাড়ি করতেই পারে, যেহেতু পাড়া বসে গেছে, এটা কোনো সমস্যা না; কিন্তু সমস্যায় পড়ল গাঁয়ের হিন্দুরা। তারা বছরের পর বছর টোকে মড়া পুড়ছে, কেউ বাধা দেয়নি। টোকে মড়া পুড়তে কেউ যে বাধা দিতে পারে, এটা হিন্দু-সম্প্রদায়ের কারও কল্পনার মধ্যেও ছিল না। কিন্তু তারা বাধার মুখে পড়ল। মড়া পুড়লে ধোঁয়া ওড়ে, দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, নতুন পাড়ার বাসিন্দারা বাধা দেওয়া শুরু করল। ‘টোকে মড়া পোড়ানো যাব না। বাড়িতে টিকন যায় না দুর্গন্ধে। লাশ মাটিচাপা দেও…।’

তখন আমি কলেজে পড়ি। সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। লেখাপড়ার ভীষণ চাপ। পারতপক্ষে বাড়ির বাইরে বেরোই না। এর মধ্যে আবার কিছু লেখালেখিও করি। হাইস্কুলের ওপরের ক্লাসে ওঠার পর থেকেই লেখালেখি শুরু করেছি। কলেজ ম্যাগাজিনে দুটো গল্প ছাপা হয়েছে। আমি যে ‘লেখক’ হওয়ার চেষ্টা করছি, ভবিষ্যৎ একেবারে খারাপ না, কলেজ ম্যাগাজিনে প্রথম গল্প ছাপা হওয়ার পরই সাদিক স্যার ডেকে নিয়ে বলেছেন, ‘সুমিত, তোমার গদ্য খুবই প্রাণবন্ত, লেখা চালিয়ে যাও’; সুতরাং লেখক হয়েও যেতে পারি, এই খবর বন্ধুমহলে চাউর হয়ে গেছে। যা-ই হোক, একদিন দুপুরবেলা, প্রচণ্ড রোদ, ভ্যাপসা গরম, তখনো বাড়িতে ফ্যান আসেনি, বাইরবাড়ি জলপাইগাছের নিচে ঘন ছায়ায় বই নিয়ে বসেছি। বাড়ির দক্ষিণ পাশ দিয়ে টোকের দিকে যাওয়ার হালট, হালটের পরই খোলা চক, বাতাস আসে। জলপাইগাছের পাতা নড়ে। বেশ ভালোই একটা আরামপ্রদ জায়গা। বইয়ের পাতায় আমার মনোযোগ। হঠাৎ ‘হরিবোল’ আর নারীকণ্ঠে উলুধ্বনি, খোল-করতালের টুংটাং শব্দ কানে আসে। শবযাত্রা। কে মারা গেল এই ভরদুপুরে? প্রশ্নটি উঠেছিল মনে, মানুষ মরবে, মরুক, কিন্তু এই তাপদগ্ধ নিরাকপড়া দুপুরে কেন? সকাল কি বিকেলের স্নিগ্ধ সময়ে মরলে ভালো হয় না? কিন্তু এই প্রশ্নটিকে পাত্তা দিলাম না। পাত্তা দেওয়ার সুযোগও নাই। মানবকুলের তো কারও জানা নাই কে কখন, কীভাবে মারা যাবে…।

আমি বেতের মোড়ায় বসে ছিলাম। বাড়িতে গোটা চারেক হাতলওয়ালা কাঁঠাল কাঠের চেয়ার আছে। সেগুলো বেজায় ভারী ভারী। টানাটানি করা মুশকিল। তখন তো এখনকার মতো আরএফএল-মার্কা হালকা ধরনের প্লাস্টিকের চেয়ার ছিল না। বেহারারা বাঁশ-বেতের মোড়া বানাত, সেগুলোই কিনতে হতো। দাদা নিজেও বানাতে পারত মোড়া। আমি উঠে দাঁড়ালাম। সবই পরিচিত মুখ। পালপাড়ার মানুষ। আমার সমবয়সী জীতেন পাল এগিয়ে এসে বলল, ‘তারক দাদু মারা গেছে…।’

তারক দাদু! তারকপ্রসাদ পাল? ‘কী হয়েছিল দাদুর…?’

‘অ্যাজমা ছিল। শ্বাসকষ্টে ভুগতেছিল অনেক দিন ধরে। বয়সও তো প্রায় নব্বইয়ের কাছাকাছি…।’

তারক দাদু যে অনেক দিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছিল, এটা আমার জানা ছিল না। আসলে হয়েছে কি, বড় হতে হতে গাঁয়ের ঘরবাড়ি, গাছপালা, বাজার-হাটখোলা, সাহাবাড়ির মতো আমিও কেমন বদলে যাচ্ছিলাম। এটাই বোধ করি সময়ের দাবি। সময়ের বিচার বললেও ভুল হবে না। অথচ দেখো, বছর তিনেক আগে, তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি, তারক দাদুর সাথে খুব খাতির জমিয়েছিলাম। দাদুর বয়স হয়েছিল, তা ঠিক, কিন্তু দেখেছি, দাদু শক্তপোক্তই ছিল। লম্বা মানুষ, একটু কুঁজো হয়ে হাঁটত, এই আরকি! দাদুর কি তখনো অ্যাজমা ছিল? হয়তো ছিল। হয়তো আরও আগে থেকেই ছিল। আমি বুঝতে পারিনি। সে তো উঠোনে বসে দিব্যি মাটির কাজ করত। মাটির হুঁকো বানানোর খ্যাতি ছিল তারক দাদুর। একেবারে কলকিসমেত হুঁকো। আমি তারক দাদুকে নাছোড়বান্দার মতো চেপে ধরেছিলাম—আমাকে একটা ছোট আকারের হুঁকো বানিয়ে দিতে হবে…।

‘মণ্ডলের নাতির এইডা কী আবদার! তুই হুঁক্কা দিয়া কী করবি? তর কি তামুক খাওয়ার বয়স হইছে…?’

‘আমি দেবদাস হব…।’

‘কী হবি…?’

‘দেবদাস…।’

‘এইডা আবার কী জিনিস…!’

‘ও তুমি বুঝবে না, দাদু…।’

আমি তখন শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ পাঁচ-ছয়বার পড়ে ফেলেছি। গালার মনা, আমার ক্লাসমেট, খুব ভালো বন্ধু, ও আমাকে বইটি পড়তে দিয়েছিল। ওদের বাড়ির আলমারিতে প্রচুর ‘আউট’ বই। মনা নিজেও বইয়ের পোকা। একদিন ওদের বাড়িতে গিয়েছি। বড় বড় দুটি আলমারিভরা বই দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ। আমিও বাড়িতে বই পড়ি। ‘দাতা হাতেম তাই’, ‘মহুয়া’, ‘মলুয়া’—এই সব। বই পড়ি মানে, দাদাকে বই পড়ে শোনাই। দাদা লেখাপড়া জানে না কিন্তু হাটবাজার থেকে এই সব বই কিনে আনে। লেখাপড়া না জানলেও তার সাহিত্যবোধ খুব উঁচু মানের। ‘বিষাদ-সিন্ধু’ও তাকে পড়ে শুনিয়েছি। তবে বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, নীহাররঞ্জন— এদের বই কখনো পড়িনি। মনাকে বললাম, বই ধার দিতে হবে। পড়ব। ও তো মহা খুশি। একজন সমমনা বন্ধু পেল। প্রথম দিন দিয়েছিল শরৎচন্দ্রের ‘রামের সুমতি’, তারপর ‘বিন্দুর ছেলে’, তারপর ‘দেবদাস’। ‘দেবদাস’ পড়ে তো আমি নিজেই আউট হয়ে গেলাম। দেবদাস বাঁশঝাড়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে তামাক খায়। আমার মাথায়ও দেবদাস হওয়ার ভূত চেপে বসল…।

রাজালি মণ্ডলের নাতি একটা আবদার করেছে, তা কি ফেলতে পারে তারকপ্রসাদ পাল? মণ্ডলের নামে গাঁয়ে বাঘে-ছাগলে এক ঘাটে পানি খায়। তারক দাদু আমাকে ছোট আকারের সুন্দর একটা হুঁকো বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দেবদাস হওয়া মুখের কথা না। সাহস দরকার। আমি তখন ভিতু গোছের ছেলে। আমি দেবদাস হতে পারিনি। সুবোধ বালকের মতো লেখাপড়ায় মনোযোগ দিয়েছি…।

‘হরিবোল’ ধ্বনি, খোল-করতালের মনকাড়া টুংটাং শব্দ ছড়াতে ছড়াতে শবযাত্রা টোকের দিকে চলে গেল…।

আমার হাতে ইংরেজি টেক্সট বই। ওয়ার্ডসওয়ার্থের একটা কবিতা পড়ছিলাম। কিন্তু পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। বারবার মনে পড়ছিল তারক দাদুর সেই সংলাপ—‘দেবদাস! এইডা আবার কী জিনিস…।’ বই হাতে ওঠবস করছিলাম। মা দুবার খেতে ডাকল। খেতেও যাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল শবযাত্রায় যাই, শবযাত্রায় যাই। শব নিয়ে ওরা কি এতক্ষণে টোকে পৌঁছে গেছে? যাওয়ার তো কথা। ১৫-২০ মিনিটের পথ। যাক, ভালোয় ভালোয় সৎকৃত্য হয়ে যাক। স্বর্গ পাক দাদুর বিদেহী আত্মা। হঠাৎ টোকের দিক থেকে শোরগোলের শব্দ ভেসে এল। কী হলো? টোকে এত শোরগোল কেন? কোনো সমস্যা? মা আবার আমাকে ডাকতে এসেছিল। আমি মার হাতে বইটা দিয়ে বললাম, ‘মা, বইটা টেবিলে রাখো। আমি একটু আসছি। এই যাব আর আসব।’

‘এই ভরদুপুরে এ্যাহন না খাইয়া কোনে যাবি?’

‘একটু টোকে যাব।’

‘টোকে! টোকে ক্যান? কার জানি মড়া গেল। শব্দ পাইলাম…।’

‘তারক দাদুর…।’

‘আহা রে! লোকটা বড় ভালো মানুষ আছিল। তা তুই এ্যাহন টোকে যাবি ক্যান?’

‘মনে হয় কোনো কারণে টোকে গোলমাল বেধেছে। একটা শোরগোলের শব্দ শুনতেছ না?’

মা টোকের দিকে কান পাতল। ‘তাই তো রে সুমিত, একটা কিসের শব্দ জানি কানে বাজে। মনে অয় শব্দটা আমাদের বাড়ির উপুর দিয়া ঝমঝম কইরা পুব দিকে মেলা দিছে…।’

নতুনপাড়ার বাসিন্দারা লাঠিসোঁটা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। সামনে জিন্নত মোল্লার দুই ছেলে কাশেম-হাশেম। তারা কিছুতেই টোকে মড়া পোড়াতে দেবে না। বোমা বিস্ফোরণের মতো গলা ফাটিয়ে হইচই করছে। এই হইচইয়ের শব্দই টোক ছাড়িয়ে আমাদের বাড়ির ওপর দিয়ে সারা গাঁয়ে ছড়িয়ে পড়ছে…।

আমরা নদীর পুব পাড়ে, ওরা পশ্চিম পাড়ে। জ্যৈষ্ঠ মাস। নদীতে পানি নাই। এখন এটিকে নদী না-বলে খাল বলাই ভালো। তবু আমরা নদীই বলি। নামটি চমৎকার—সুনন্দা। কে জানে, নদীটির এত সুন্দর নাম কে রেখেছিল! আমি ওদের মুখোমুখি দাঁড়ালাম। ওপারে ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল। মণ্ডলের নাতি এসেছে যে! সে কেন এখানে? ভেজাল লাগাবে নাকি? দাদার প্রতাপের কথা আগেই বলেছি। একবার হয়েছে কি, আমি তখন ছোট, সবে প্রাইমারি স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি; সরকারবাড়ির দুই ভাইয়ের মধ্যে জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব, গাঙের টানে দশ বিঘার একটা ছাম আছে তাদের, বড় সরকার-ছোট সরকার দুজনেই ছামের পুরোটাই নিতে চায়, ভাগ করে নেবে না, এই নিয়ে দ্বন্দ্ব; এ নিয়ে দুই পক্ষের লোকদের মধ্যে একদিন মারামারি হয়েছে, দুপক্ষই মামলা করেছে থানায়, একদিন দুই ভাই মুখোমুখি, দুজনের হাতেই দোনলা বন্দুক, খবর রটে গেল গ্রামে, ভয় ও আতঙ্ক সবার মাঝে—আজ না জানি কী হয়! দাদা বাড়িতে ছিল, ছুটে গেল সরকারবাড়ি, আমাদের বাড়ি থেকে সরকারবাড়ি খুব একটা দূরে নয়, দশ-বারো বাড়ির ব্যবধান, সরকারবাড়ি পৌঁছাতে দাদার সময় লাগল না; দুই সরকার তখন নিজ নিজ ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের বুক তাক করে বন্দুক ধরেছে, দাদা উঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাঘের মতো হুংকার ছাড়ল—‘বন্দুক নামাও, দুইজনেই বন্দুক নামাও…।’

গাঁয়ে কার এত সাহস যে রাজালি মণ্ডলের হুংকার শোনার পরও হাতে বন্দুক রাখে? দুই সরকারই হাতের বন্দুক মাটিতে রাখল। সাপের মাথায় ওঝার কাঠি ছোঁয়ালে সাপ যেভাবে মাথা নোয়ায়, বড় সরকার, ছোট সরকার—দুজনেই তেমনি মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এখন দাদা নাই, কিন্তু রাজালি মণ্ডলের নাতি হিসেবে আমাকে গাঁয়ের মানুষ বেশ সমীহ করে, তদুপরি ভালো ছাত্র হিসেবে আমার সুনাম আছে, আবার লেখক হয়ে উঠছি—সুমিত জহিরের কথার গুরুত্ব দেয় গ্রামবাসী। আমি বললাম, ‘কী হয়েছে, কাশেম ভাই? তোমাদের হাতে লাঠিসোঁটা! এত হইচই করছ কেন?’

‘কিছু হয় নাই।’

‘কিছু হয় নাই তো লাঠিসোঁটা হাতে, শোরগোল তুলেছ…?’

‘টোকে মড়া পোড়াবার দিমু না।’

‘টোক নদীর এপারে, তোমরা ওপারের বাসিন্দা, সমস্যা কী?’

‘ধুমা ছড়ায়, মরার ত্যালপোড়া গন্ধ ছড়ায়। বাড়িতে টিকন যায় না।’

‘এটা একটা ধর্মীয় কাজ। নিজেদের একটু কষ্ট হলেও এই কাজে বাধা দেওয়া ঠিক না। বহুদিন ধরেই টোকে মড়া পোড়ানো হচ্ছে…।’

‘আগে কী হইছে, তা আগের কথা। তহন টোকপাড়ে বাড়িঘর আছিল না। লাশ মাটির নিচে গাইড়া থুইকো…।’

‘এই খবর ডিসি-এসপির কানে গেলে তোমাদের কিন্তু বিপদ হবে…।’

‘দেখা যাবোনি ডিসিয়ে-এসপিয়ে কী করে। আমাগো সাফ কথা, টোকে মড়া পুড়বার দিমু না।’

ওরা লাফাতে লাফাতে চলে গেল। আমি জানি, ওরা যতই হইচই করুক, যতই লাফালাফি করুক, রাজালি মণ্ডলের নাতি যেখানে এসেছে, যতটুকু যা করার ওরা করেছে, আর বাড়াবাড়ি করবে না। আমরা তারকপ্রসাদ পালের সৎকৃত্য করলাম।

তারকপ্রসাদ পালের সৎকৃত্য টোকে হলো বটে, কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মনে একটা ভয় ঢুকে গেল। ভয় সংক্রামক রোগের মতো। একজন থেকে আরেকজনে, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে, এক গাঁ থেকে আরেক গাঁয়ে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের গাঁয়ে তো ছড়িয়ে পড়লই! হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ মারা গেলে আর তার মরদেহ টোকে দাহ করতে যাবে—এই সাহস কেউ পায় না। তারকপ্রসাদ পালের মরদেহ না হয় শেষ পর্যন্ত দাহ করা গেছিল, কিন্তু মণ্ডলের নাতিকে, হিন্দুবাড়ির কেউ মারা গেলে সৎকার করার সময় তাকে কাছে পাওয়া যাবেই, এই গ্যারান্টি তো দেওয়া যায় না। সে এখন চাকরিবাকরি করে, বড় লেখক হয়ে উঠছে; তার কত কাজ, কত ব্যস্ত সে—হিন্দুবাড়ির কেউ মারা গেলে তখন তাকে না পাওয়া গেলে উপায় কী?

হিন্দুপাড়ার, যাদের বাড়ি বড়, বাড়িতে মরদেহ সৎকারের জায়গা আছে, তারা বাড়িতেই মড়া পোড়ায়, বাকিরা বাড়ির কোথাও লাশ মাটির নিচে পুঁতে ফেলে। কিন্তু ব্যতিক্রমও আছে। ঘাড়তেড়া কিছু লোক থাকে না, সবখানেই থাকে, তারা গোঁ ধরে—টোকেই মরদেহ পোড়াবে, মড়ার সৎকৃত্য করবে, তারা নতুনপাড়ার বাসিন্দাদের হুমকি-ধমকিকে পরোয়া করে না, টোকেই যায় স্বজনের মৃতদেহ নিয়ে, টোকেই লাশ দাহ করবে; তারা আমাকে শবযাত্রার সঙ্গী করে। খবর পেলে, হিন্দুবাড়ির কেউ মারা গেছে, টোকে তার লাশের দাহ করবে বলে স্বজনেরা মনস্থির করেছে, আমার জন্য অপেক্ষা করছে, সুযোগ পেলেই আমি ছুটে যাই। তারকপ্রসাদ পালের মরদেহ দাহ করার দিন নতুনপাড়ার লোকেরা যেমন হইচই ও লাফালাফি করা সত্ত্বেও আমাকে দেখে সরে গেছিল, এই, এত দিন, ২৫ কি ৩০ বছর পর, এখনো শবযাত্রার সঙ্গী হয়ে আমি টোকে গেলে—ওরা কেউ আর সামনে আসে না।

ওরা কেউ সামনে না আসুক, টোকপাড়ে লাশের সৎকৃত্যে বাধা না দিক, এটা ভিন্ন প্রসঙ্গ, আসলে টোকপাড়ে এখন গাঁয়ের অনেকেই লাশের সৎকৃত্য করতে যেতেই চায় না। মাইল চারেক দূরে, টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের পাশে, বানিয়াবাড়িতে সরকারের উদ্যোগে শ্মশানঘাট নির্মিত হয়েছে। ইলেকট্রিক চুল্লিতে মড়া পোড়ানো হয়। ইন্ডিয়ার মতো পদ্ধতি বাংলাদেশেও চালু হয়েছে। সামান্য ফি দিতে হয়। দুই শ কি চার শ টাকা। তা টাকা যা নেবার নিক। একদম ঝামেলা নাই। চলাখড়ি জোগাড় করতে হয় না। কেরোসিন তেল কিনতে হয় না। বেশি লোকজন, মানে তেমন শ্মশানবন্ধুরও দরকার পড়ে না। একটা ভ্যানে তুলে লাশ নিয়ে গেলেই চলে। যা যা করার, অর্থাৎ ধানদূর্বা-বেলপাতা সংগ্রহ, ঠাকুরের মন্ত্রপাঠ, পাপমোচনের প্রার্থনা; ঈশ্বরবন্দনা—সবই পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকেরাই করে। তাহলে গাঁয়ের টোকে মৃত স্বজনের সৎকৃত্য করতে গিয়ে ঝামেলা পোহানোর কী দরকার?

কিন্তু সাবুদির লাশ তার পেছনবাড়িতে কাঁটাবন আর ঝোপজঙ্গলের মধ্যে পুঁতে ফেলা হবে কিংবা বানিয়াবাড়ি শ্মশানঘাটে নেওয়া হবে—তাই কি হয়! দিদির দাদা, দাদার বাবা, দাদার দাদা—সবাই গাঁয়ের জমিদার ছিল। তাদের বাড়িতে নদী ঘেঁষে ছিল পাকা শ্মশানঘাট। সাবুদির দাদার বাবা, দাদার দাদার চিতা নাকি সাজানো হয়েছিল চন্দন কাঠ দিয়ে। ঘি ঢেলে অগ্নিসংযোগ করেছিল পূজারিরা। দিদির বাবার আমলটা ছিল পড়ন্ত বেলা। তবু প্রশান্ত তালুকদারের শানশওকত একেবারে কম ছিল না। কিন্তু এখন সেসবের কিছুই নাই। না তালুকদারবাড়ি, না সেই শ্মশানঘাট! সেসব ধুলোয় মিশে গেছে। সময়ের বিবর্তনে এই-ই হয়। তালুকদারবাড়ি এখন নায়েববাড়ি। কিসমত আলী নায়েব পুরোনো, জীর্ণ সব দালানকোঠা ভেঙে নতুন দালান তুলেছে। শ্মশানঘাটের চিহ্নও নাই; তা, কিছুই না থাক, সুনন্দার টোক তো আছে। নদীর টোকেই, নতুনপাড়ার মানুষের বাধা যদি আসেও, এত দিন পর টোকে আবার চিতা কেন, ওরা লাঠিসোঁটা নিয়ে বেরিয়ে এল, তারপরও সাবুদির লাশের সৎকৃত্য টোকেই হবে।

পথে সাবুদির শবযাত্রা, তাতেই বোধ করি বুদ্ধপূর্ণিমার চাঁদ তার প্রকৃত যৌবন প্রস্ফুটিত করেছে। আকাশ অবিশ্বাস্য রকম পরিষ্কার। একটুকরো মেঘের আভাস পর্যন্ত নাই কোথাও। বরফকুচির মতো জোছনা ভেঙে পড়ছে আমাদের মাথায়। সাবুদি বলেছিল, দেখিস সুমিত, কোনো এক বুদ্ধপূর্ণিমার রাতে আমি দেহত্যাগ করব। আমি অবাক হয়েছিলাম দিদির কথা শুনে। কেউ কি বলতে পারে সে অমুক রাতে মারা যাবে? কিন্তু সাবুদি বলেছিল। তাও বছর পাঁচেক আগের কথা। দিদি খুব অসুস্থ ছিল। প্রচণ্ড জ্বর। সাথে বমি। জ্বর এক শর নিচে নামছিলই না। বারবার বমি করছিল। আমি চেষ্টা করলাম—দিদিকে হাসপাতালে নিয়ে যাব। পরিস্থিতি এমন যে ওষুধ খাওয়ার পরপরই বমি করে, কিন্তু দিদি হাসপাতালে যাবে না। দিন দিন শরীর ভেঙে পড়ছে। দেবী দুর্গাকে যেন খালের পানিতে ডোবানো হয়েছে, পানি কমায় বেরিয়ে পড়ছে দুর্গার বাঁশ-কাঠের কাঠামো। আমি বিমর্ষ হয়ে তার পাশে বসে ছিলাম। সাবুদি বলল, ‘ভয় পাসনে, সুমিত। এখন তো কৃষ্ণপক্ষ। তা ছাড়া বুদ্ধপূর্ণিমা অনেক দূরে। বুদ্ধপূর্ণিমার রাত ছাড়া আমার মৃত্যু হবে না।’ কী আশ্চর্য! দিদির কথাই ফলে গেল!

শবযাত্রায় লোকসমাগম নগণ্য। মাত্র ২০-২৫ জন। গ্রাম ছেড়ে যেতে যেতেও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন যা কিছু আছে, আধাআধি বাড়ি থেকে একজন করে শবযাত্রায় যোগ দিলেও তিন কুড়ি কি চার কুড়ি, কিংবা এক শ লোক হওয়াও অস্বাভাবিক কিছু না। কারও কারও শবযাত্রায় প্রচুর লোকজন দেখিও। কিন্তু তারা কেউ সাবুদির শবযাত্রায় যোগ দেয়নি। নিজের মা-বাবা-বংশের মুখে কালি দিয়ে, জাত-ধর্মের মাথা খেয়ে যবনের ছেলেকে বিয়ে করেছিল। বেজাত মেয়েলোক। তার শবযাত্রায় কে যাবে? দিদি ছিল তাদের চক্ষুশূল। মালি-ঢুলি-বেহারাবাড়ির কয়েকজন এসেছে মাত্র।

সাবুদির সৎকৃত্য হিন্দুশাস্ত্রমতে, নাকি মুসলিম রীতিতে হবে—এই নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। স্বাধীনতার এক বছর পর, কড় গুনে গুনে, ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর, বিজয় দিবসের দিন, সাবুদি আনোয়ার ভাইকে বিয়ে করেছিল। মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন তখন গাঁয়ের হিরো। মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে হলে হবে কি, আমাদের গ্রামে তো বটেই, চারপাশের সব গ্রামেও তার খুব নামডাক। আমরা ছোট ছোট, কারও বয়স ৫-৬, কারও ৭-৮, কারও ৯-১০; আমরা তার কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনি। কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছে, কীভাবে পাকিস্তানি হানাদারদের খতম করেছে, ব্রিজ ভেঙেছে কটি—রোমাঞ্চকর সব গল্প শোনায় আনোয়ার ভাই। তার উৎসাহে আমরা ভবিষ্যৎ বাহিনী গড়ে তুলেছি। বাঁশ-কাঠ দিয়ে বন্দুক বানিয়েছি। আমাদের বাড়ির পেছনে বেশ বড় একটা আম-কাঁঠালের বাগান। ওই বাগানে সকাল-বিকেল বন্দুক হাতে মার্চপাস্ট করি। মুক্তিযোদ্ধা সাজি। কাল্পনিক হানাদার বাহিনীর ওপর আক্রমণ করি। ওরা কেউ কেউ আমাদের গুলিতে খতম হয়, কেউ কেউ রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যায়। আমরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বিজয়োল্লাস করি। আনোয়ার ভাই আমাদের পিঠ চাপড়ে আদর করে। সাবুদি ১৫ ডিসেম্বর রাতে আনোয়ার ভাইদের বাড়িতে এসে ওঠে। আনোয়ার ভাইয়ের মায়ের সাথে রাত কাটায়। পরদিন সকালে বিজয় দিবসে তোপধ্বনি হাঁকিয়ে দুজনে বিয়ে করে। এই বিয়ে নিয়ে গ্রাম উত্তাল হয়ে উঠেছিল। আনোয়ার হিন্দুদের জাত মেরেছে। যেকোনো সময় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বেধে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত দাঙ্গা অবশ্য হয়নি। দিনে দিনে গাঁয়ের মানুষের উত্তেজনা থিতিয়ে এসেছিল। শোনা গেছে—প্রশান্ত তালুকদারও শান্ত হয়েছিল। যা হবার তা তো হয়ে গেছে। ভগবান এই-ই লিখে রেখেছিল ললাটে। দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা মামলা-মোকদ্দমা করেই-বা লাভ কী? কুলত্যাগী মেয়েকে তো আর ঘরে তোলা যাবে না। শুধু রাগ কমছিল না প্রশান্ত তালুকদারের বউয়ের। আরতি তালুকদার জোড়া পাঁঠা মানত করে রেখেছিল। ওরা দুজনে অপঘাতে মারা গেলে জোড়া পাঁঠা বলি দিয়ে কালীপূজা করবে। আনোয়ার ভাই খুন হওয়ার পর এটাই তো সবচেয়ে বড় অপঘাতের মৃত্যু, আরতি তালুকদার বাড়িতে জোড়া পাঁঠা বলি দিয়ে কালীপূজা করতে পারত, কিন্তু সেই সুযোগ সে পায়নি, আনোয়ার ভাই খুন হওয়ার আগেই তারা দেশ ছেড়েছিল।

তখন দেশে চরম অরাজকতা শুরু হয়েছে। বাজারের পাটের গুদামে অগ্নিসংযোগ, রেশনের দোকান লুট, বেছে বেছে আওয়ামী লীগ নেতাদের, ধনী লোকদের বাড়িতে ডাকাতি, তাও আবার হিন্দু-মহাজনবাড়িই প্রথম টার্গেট—কী দিন যে এসেছিল স্বাধীনতার পর! দেশের মানুষ ভেবেছিল—স্বাধীনতা পেলাম, এখন আর কোনো দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা থাকবে না, ভয়ভীতি থাকবে না; কিসের কী! মানুষের রাতের ঘুম তো হারামই, দিনের তন্দ্রাও হারাম। গণবাহিনীর লোকেরা, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দিনের বেলায়ই ওরা পাটের গুদামে আগুন দেয়, লুটপাট করে, আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি থেকে ধরে এনে প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ার করে। পুলিশ ওদের টিকিটিও ছুঁতে পারে না। পুলিশের কাছে আর কী অস্ত্র আছে, দোনলা বন্দুক, ওদের হাতে সব স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। পুলিশ ব্যর্থ। সরকার রক্ষীবাহিনী নামিয়েছে, তাদের হাতেও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র আছে, কিন্তু তারাও ব্যর্থ হওয়ার পথে। গণবাহিনীর সদস্যরাও একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য। দলটির নাম—জাসদ। গণবাহিনী জাসদের সশস্ত্র সংগঠন। তাদের এই যে সরকারের সম্পত্তি বিনাশ, মানুষ খুন, ডাকাতি—এটা নাকি শ্রেণিসংগ্রাম। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ-বৈষম্য দূরীকরণের সংগ্রাম। এটা রাজনীতির বিষয়, এই আখ্যানের সাথে যাবে না। এখানেই তোলা থাক…।

গণবাহিনীর বড় একটা অংশই মুক্তিযোদ্ধা। সাথে যোগ দিয়েছে কিছু তরুণ ছাত্র। এই ছাত্রদের অনেকেই খুব মেধাবী। জাসদের ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ কায়েমের স্বপ্নে বিভোর হয়ে তারা এসেছে। লুটপাট ও ডাকাতি করছে, অকাতরে মানুষ খুন করছে, তাদের হিসাবের খাতায় শ্রেণিশত্রু খতম, ওরা হিসাবও রাখে এই সব খুনের, কে কটি খুন করতে পারল; কারও মনে বিন্দুবিসর্গ অনুশোচনা নাই, তাদের হিসাবটা এ রকম—বিপ্লব সংঘটিত করতে হলে এ ধরনের দু-চারটা খুন করা দোষের কিছু নয়। শ্রেণিশত্রু  খতম করাটাই বড় কথা, বিপ্লব সফল করার জন্য। তো, এই খুনখারাবি হিসাবের মধ্যে নেওয়ার কোনো দরকার নাই…।

আনোয়ার ভাইয়ের কাছেও প্রস্তাব এসেছে, জাসদে যোগ দিতে হবে, গণবাহিনীতে যোগ দিতে হবে। আনোয়ার ভাই সাড়া দেননি। তিনি হিসাব মেলাতে পারছেন না—সদ্য স্বাধীন দেশে কেন আবার সশস্ত্র বিপ্লব! আর বিপ্লবের নামে কেন বাজার লুট, দোকান লুট, ডাকাতি, খুন—সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা দার্শনিকেরা, কাল মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেলিন, মাও সে-তুং, তারা কি বিপ্লব করার জন্য এই ধরনের খুন-ডাকাতির থিওরি দিয়ে গেছেন…? অথচ দ্যাখো, কিছুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মোহে পড়ে দেশে কী অরাজকতাই না সৃষ্টি করছে! দলের নেতারাও সবাই, কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, কেউ কেউ রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন…।

আতান্তরে পড়ে যান আনোয়ার ভাই।

একদিন মধ্যরাতে, দুদিন আগে পূর্ণিমা ছিল, আকাশে কাঁসার বড় থালার মতো গোল চাঁদ, জোছনা ভেঙে পড়ছে অবিরত, আনোয়ার ভাই সাবুদিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছেন, তার ঘরের দরজায় পরপর তিনটি টোকা পড়ল। ঘুম ভেঙে গেল আনোয়ার ভাইয়ের। ঘরের দরজায় এত রাতে টোকা মারছে কে? এ যেন যুদ্ধকালীন সিগন্যাল। পাহাড়ের হেডকোয়ার্টার থেকে ভূঞাপুরের ক্যাম্পে কোনো খবর এসেছে। সিগন্যালম্যান আবদুস সালাম ক্যাম্পের দরজায় টোকা মারছে। পাঁচ-সাত-দশ, শালগ্রামপুর থেকে বার্তা এসেছে…।

হারিকেনের সলতে উসকে দিয়ে দরজার খিল খুলে আনোয়ার ভাই দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে? কোন ক্যাম্পের সিগন্যাল?’

গণবাহিনীর একটি দল এসেছে, এই দলের নেতা আবদুল কাদের। আনোয়ার হোসেনের পূর্বপরিচিত। বয়সেও বড়। মাকরাইয়ের যুদ্ধে মরতে মরতে বেঁচে গেছিলেন। এই যুদ্ধে সিএনসি কাদের সিদ্দিকীও গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তার ডান হাতের তালুতে হানাদারদের গুলি লেগেছিল। যাহোক, পাকিস্তানি হানাদারদের একটা গুলি কোম্পানি কমান্ডার আবদুল কাদেরের মাথার আধা ইঞ্চি ওপর দিয়ে চলে যায়। সময়মতো মাথাটা নিচু করতে না পারলে আবদুল কাদেরের মাথার খুলি উড়ে যেত, মগজ বেরিয়ে ছিটকে পড়ত এদিক-সেদিক; তিনি সেদিন শহীদ হতেন। আজ, এই মধ্যরাতে গণবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে এসে তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে পারতেন না। কমান্ডার কাদের বললেন, ‘আনোয়ার, মুক্তিযুদ্ধ সেই কবেই শেষ হয়ে গেছে। এখন কোনো সিগন্যাল কোর নাই, সিগন্যালম্যান নাই…।’

‘স্যার, আপনি…?’

‘বাইরে আসো। বসার ব্যবস্থা করো।’

ঘরে দুটো খেজুরপাতার চাটাই ছিল। আনোয়ার ভাই চাটাই দুটো এনে উঠোনে বিছিয়ে দিলেন। সাবুদি ঘুম ঘুম চোখে কী যেন বলতে চাইছিল। আনোয়ার ভাই তাকে আধো অন্ধকারেই চোখের ইশারায় চুপচাপ থাকতে বললেন। দিদির হৃৎকম্প শুরু হয়ে গেল। এত রাতে কারা এল? কী হচ্ছে? কিন্তু কথা বলার সুযোগ নাই। গণবাহিনীর সদস্যরা চাটাইয়ের ওপর গোল হয়ে বসল। সবার হাতেই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। সবাই যেন মুক্তিযোদ্ধা। ধলাপাড়ার ক্যাম্পে বসে যেন কোনো হানাদার ক্যাম্পে ভোররাতে আক্রমণ করার আগে সলা-পরামর্শ করছে।

আবদুল কাদের বললেন, ‘কোনো ভণিতা করব না, আনোয়ার। যা বলার সোজাসুজি বলি…।’

‘জি, স্যার। বলেন, স্যার।’

‘লিডার চিঠি দিয়েছিলেন, পাওনি?’

‘লিডার…!’

‘আমি সোজাসাপটা কথা বলছি, তুমিও সোজাসাপটা কথা বলবে, আশা করি লিডার কে জানো। এখন লিডার একজনই, হুরমুজ বিএসসি। আমরা তার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ করি নাই, তা ঠিক, কিন্তু এখন তার নেতৃত্ব মেনে নিয়েছি। তুমি শিক্ষিত মানুষ। আমার মতো বকলম মুক্তিযোদ্ধা না। যুদ্ধ শেষে তুমি আবার লেখাপড়া শুরু করেছ, তাও জানি। ঘরে নতুন বউ—এটা তো সবাই জানে। যাহোক, তোমাকে বুঝিয়ে বলার দরকার নাই, তুমি নিশ্চয়ই সবই বোঝো, কেন জাসদের জন্ম? কেন গণবাহিনী গঠিত হয়েছে। শেখ মুজিবের ডাকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, আমরা যুদ্ধে গেছিলাম, দেশ স্বাধীন করেছি—সবই ঠিক আছে। কিন্তু রেসকোর্স ময়দানের সেই শেখ মুজিব, আর এখনকার শেখ মুজিব এক না। আকাশ-পাতাল তফাত।

‘শুধুই শেখ মুজিব? তাঁকে বঙ্গবন্ধু বলবেন না?’

‘না। শেখ মুজিব এখন আর বাংলার মানুষের বন্ধু নন।’

‘তিনি এখন কী তাহলে?’

‘শেখ মুজিব এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্বৈরাচার…।’

‘তাই! কী চান তাহলে আপনারা?’

‘শেখ মুজিবকে উৎখাত না করা পর্যন্ত দেশের মানুষের মুক্তি নাই।’

‘কীভাবে তাঁকে উৎখাত করবেন?’

‘সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে।’

‘কিন্তু বিপ্লবের নামে আপনারা যা শুরু করেছেন, লুটপাট, ডাকাতি, খুন—এভাবে বিপ্লব হবে না।’

‘আনোয়ার, তোমার কাছে আমরা জ্ঞান নিতে আসি নাই। তোমার নিজের কথা বলো। লিডারের চিঠি মোতাবেক তুমি জাসদ-গণবাহিনীতে যোগ দেবে কি দেবে না, তা-ই বলো।’

‘না। জাসদ-গণবাহিনীর আদর্শ-উদ্দেশ্য-কর্মপরিকল্পনার সাথে আমি একমত হতে পারছি না। সুতরাং আমার পক্ষে এই দলে যোগদান করাও সম্ভব হচ্ছে না।’

আবদুল কাদের ঝটতি উঠে দাঁড়ালেন। সাথে সাথে উঠে দাঁড়াল বাকি সবাই। হারিকেনের তেল ফুরিয়ে এসেছে, আলো কম। তবে চাঁদের প্রলম্বিত জোছনা ছড়িয়ে পড়েছে উঠানে। গণবাহিনী-সদস্যদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রগুলো চাঁদের আলোয় ঝকমক করছে। কাদের নিজের অস্ত্রটি কাঁধে ঝুলিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত গোখরা সাপের মতো রাগে ফুঁসে উঠলেন। বললেন, ‘আনোয়ার, লিডার বলেছেন, তুমি কাদেরিয়া বাহিনীর একজন চৌকস মুক্তিযোদ্ধা। জীবনের মায়া ত্যাগ করে অনেক দুঃসাহসী অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছ। লিডারের কাছে খবর আছে, তুমি এখন আমাদের শত্রুপক্ষের লোক। শ্রেণিশত্রু। তবে আজই তোমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার হুকুম নাই। লিডার এক মাস সময় দিয়েছেন। ভালো করে ভেবে দেখো, কী করবে। আর হ্যাঁ, কিছুক্ষণ পরই আমরা তোমার শ্বশুরবাড়িতে অপারেশন চালাব। তোমরা যাকে ডাকাতি বলো, এটা রাজনৈতিক মূর্খদের হিসাব, এটা ডাকাতি না; এটা আমাদের রাজনৈতিক অপারেশন, দেশে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েমের পথ সুলভ করার সশস্ত্র উদ্যোগমাত্র।’

তালুকদারবাড়িতে খ খ জোছনারাতে ডাকাতি হলো। গাঁয়ের কেউ জানতেও পারল না ডাকাতির খবর। জানবে কী করে? বাড়িতে কেউ চিৎকার-চেঁচামেচি দূরে থাক, একটা টুঁ শব্দ পর্যন্ত করতে পারেনি। ডাকাতরা বড় তালুকদার, ছোট তালুকদারের ঘরের টাকাপয়সা, সোনাদানা, সিন্দুকে-আলমারিতে, বিছানার কাঁথার নিচে, বালিশের খোলে, ঘরের মেঝেয় খোঁড়া কুয়াসদৃশ গর্তের ভেতর লুকানো—যেখানে যা ছিল, সব নিয়ে গেল। সাথে নিয়ে গেল প্রশান্ত তালুকদারের ছোট মেয়ে সুতপাকে। ছোট তালুকদার লাইসেন্সকৃত দোনলা বন্দুক নিয়ে ডাকাতদের মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু সে গুলি করার সুযোগ পায়নি, তার আগেই সুশান্ত তালুকদারের লাশ ফেলে দিয়েছিল ডাকাতরা…।

বাড়িতে ডাকাতি হওয়ার পর প্রশান্ত তালুকদার বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছিল। তার মুখে কোনো ভাষা ছিল না। দিনরাত কান্নাকাটি করত আরতি তালুকদার। শেষ পর্যন্ত তার চোখের পানি শুকিয়ে গেল। চোখ থেকে পানি আর ঝরে না। তার বড় মেয়ে নিজে কুলত্যাগী হয়েছে। ছোট মেয়েকে ডাকাতরা নিয়ে গেল…!

প্রশান্ত তালুকদার এক মাসের মাথায় সপরিবার দেশ ত্যাগ করল। যে রাতে ওরা বাড়ি ছাড়ে, ওই রাতে, বাড়ি ছাড়ার আগে, রাত এগারোটার দিকে প্রশান্ত তালুকদার আনোয়ার ভাইদের বাড়িতে এসেছিল। গ্রাম তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। কোথাও একটা গাছের পাতা পড়ার শব্দও নাই। আনোয়ার ভাই কী একটা কাজে সকালে ঢাকা গেছে। দুদিন পর বাড়ি ফিরবে। সাবুদির একা একা ঘুম আসছে না। শুয়ে শুয়ে শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ পড়ছে। ঘরের দরজায় দুটো মৃদু টোকা পড়ল। চমকে উঠল সাবুদি। আনোয়ারের তো আজই ফেরার কথা না। আর সে তো বাড়িতে এসেই ‘সাবু কই, সাবু কই’ বলে বাড়ি তোলপাড় করে ফেলে। তাহলে ঘরের দরজায় টোকা দিল কে? সেই দুর্বৃত্তরা নয় তো? সাবুদি ভীতকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কে, দরজায় কে?’

হারিকেন সাবুদির মাথার কাছে। পুরো ঘর আলোকিত হয়নি। দরজার কাছে আবছা আবছা কুয়াশার মতো অন্ধকার। এই অন্ধকার অতিক্রম করে সাবুদির গলার আওয়াজ বাইরে গেল কি না, বোঝা গেল না। তবে দরজার বাইরে প্রশান্ত তালুকদারের গলার স্বর শোনা গেল। ‘সাবু, আমি…।’ তার গলার স্বরও ভেজা, ক্ষীণ, ঝড়ে আহত শালিক পাখির গলার স্বরের মতো অস্ফুট কান্নামিশ্রিত।

আরে! এ যে বাবার গলা! সাবুদি ঝটপট দরজা খুলল। ‘বাবা, তুমি…!’

‘তোকে দেখতে এলাম। কেমন আছিস?’

‘ভালো আছি, বাবা। ভগবান ভালো রেখেছে।’

‘ভগবান…!’

‘হ্যাঁ, বাবা, আমি তো মনেপ্রাণে হিন্দুই আছি। গীতা পড়ি। ভগবানকেই ডাকি…।’

সাবুদি নিজের ইচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে আনোয়ার ভাইকে বিয়ে করার পর এই প্রথম প্রশান্ত তালুকদার মেয়ের বাড়ি এসেছে। সাবুদি উতলা হয়ে উঠল। বাবাকে এত রাতে কী খাবার দেবে? প্রশান্ত তালুকদার রাতে এক বাটি দুধ আর এক মুঠো পায়রার ছাতু খায় মাত্র। সাবুদি বলল, ‘তোমাকে এখন কী খেতে দিই, বাবা?’

‘আমার খাওয়ার জোগাড়ের জন্য তোকে উতলা হতে হবে না। তোকে একটা কথা বলতে এসেছি, মা।’

‘কী কথা, বাবা?’

‘আমরা চলে যাচ্ছি।’

‘চলে যাচ্ছ!’

‘হ্যাঁ। আজ রাতেই।’

সাবুদি বাবাকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল।

গণবাহিনী আনোয়ার ভাইকে নিজের সাথে বোঝাপড়া করার জন্য এক মাস সময় দিয়েছিল। তবে এক-দুই মাসে তাদের আর কোনো তৎপরতা ছিল না। তিন মাস পুরো হওয়ার এক দিন আগে আনোয়ার ভাই চিঠি পেল। ‘প্রিয় আনোয়ার, শুভেচ্ছা জেনো। তোমাকে এক মাস সময় দেওয়া হয়েছিল। তিন মাস কেটে যাচ্ছে। তুমি কোনো যোগাযোগ করলে না। শুনছি, ঢাকায় দৌড়াদৌড়ি করছ। শেখ মনির সাথে দেখা করেছ। কোনো লাভ নাই। গণবাহিনীর আদালতে তোমার মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে। অচিরেই কার্যকর করা হবে। ইতি…।’

চিঠি পাওয়ার পরদিনই আনোয়ার ভাইয়ের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর হয়ে গেল। দুপুরের পরপর, আনোয়ার ভাই কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছিল, বাড়ির অদূরে, রাস্তার তিনমোড়, যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরে যুদ্ধজয়ের স্মারক হিসেবে ওই মোড়ে আনোয়ার ভাই একটা বটগাছের চারা রোপণ করেছিল, চারাটি লকলক করে বেড়ে উঠছে, ওই বটচারার কাছেই দুর্বৃত্তরা ব্রাশফায়ার করে আনোয়ার ভাইকে মেরে ফেলল। দুর্বৃত্তরা হঠাৎ কোত্থেকে এল, চোখের পলকে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে কই যে গেল, কেউ বুঝেই উঠতে পারল না। 

আনোয়ার ভাই নিহত হওয়ার সাত দিন যেতে না যেতেই, কুলখানিটা হয়েছেমাত্র, দরবেশ মোল্লা, আনোয়ার ভাইয়ের বাবা নতুনরূপে আবির্ভূত হলো। সে বলতে শুরু করল, হিন্দুর মেয়ের জায়গা হবে না আমার বাড়িতে। মুসলমানের সাথে বিয়ে হয়েছে, অথচ নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না, ঘরে নাকি গীতাও আছে, দুই নায়ে পাও দেওয়া এই রকম মেয়ের আমার বাড়িতে জায়গা নাই। অথচ দেখো, আনোয়ার ভাই সাবুদিকে বিয়ে করল, দরবেশ মোল্লা তখন দারুণ খুশি, চোখে সুরমা দিয়ে, দাড়িতে মেহেদি মেখে, রঙিন চাদর গায়ে দিয়ে পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়; একটা হিন্দুর মেয়েকে মুসলমান বানানো গেছে, এটা বড়ই সওয়াবের কাজ। সাবিত্রী তালুকদারের নাম রাখা হয়েছিল ফাতেমা বানু। নবী মুহাম্মদের (সা.) মেয়ের নামে নাম।

একদিন সকালে দরবেশ মোল্লা সাবুদিকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে সত্যি সত্যি বাড়ি থেকে বের করে দিল। আসলে গ্রামে কানাকানি শুরু হলো, হিন্দু-মুসলমান কোনো ব্যাপার না, দরবেশ মোল্লার জায়গাজমিতে তালুকদারের বেটি যাতে ভাগ বসাতে না পারে, এ জন্যই আগেভাগে এই ব্যবস্থা।

সাবুদি এখন কোথায় যাবে? মা-বাবা দেশে নাই। গাঁয়ের কোনো আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ওঠার জো নাই। দিদি দাঁড়িয়ে আছে তিনমোড়ের সেই চারা বটগাছটির কাছে। যে বটের চারা লাগিয়েছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন, যে চারাগাছটির কাছেই সে খুন হয়েছে, গাছটির কাণ্ডে, সরু ডালে, পাতায় পাতায় আনোয়ার হোসেনের রক্তের দাগ লেগে আছে; যদ্দুর দিদির চোখ যায়, সামনে শুধু অন্ধকার, ঘন কালো নিকষ অন্ধকার।

সাবুদি আমাদের বাড়িতে এসে উঠল।

আমার মেজপা সাবুদির বান্ধবী। দুজনে একসাথে পড়েছে। মেজপারও বিয়ে হয়েছে। সেদিন আমাদের বাড়িতেই ছিল। কদিন আগে নাইয়র এসেছে। মেজপা সাবুদিকে দাদার ঘরে নিয়ে গেল। দাদা বলল, ‘তালুকদারের বেটি, তোমার কোনো ভয় নাই। তোমার ভার আমি নিলাম। সব ব্যবস্থাই আমি করমু।’

প্রশান্ত তালুকদার দাদার চেয়ে বয়সে ছোট হলেও দুজনের মধ্যে হৃদ্যতা ও বন্ধুত্ব ছিল খুব গভীর। ওই সময়েই তালুকদারবাড়িতে চায়ের পাট ছিল। দাদা প্রত্যেক দিন সকালে চা খেতে তালুকদারবাড়ি যেত। আরতি তালুকদার দাদাকে বড় ভাইয়ের মতো ভক্তি-শ্রদ্ধা করত। সেই তালুকদারবাড়ির মেয়ের বিপদে দাদা যে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবে, তাতে তো সন্দেহের কোনো অবকাশ নাই।

আমাদের আম-কাঁঠালের বাগানের পশ্চিম পাশে ২০-২৫ শতাংশের একটা ভিটাবাড়ি পড়ে ছিল। পতিত। সেখানে কোনো আবাদ ছিল না। ঝোপজঙ্গল-কাঁটাগুল্ম গজিয়ে ওই ভিটা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। দাদা চার-পাঁচটা কামলা নিয়ে ওই পোড়ো ভিটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে একটা চমৎকার বাড়ি বানিয়ে ফেলল। একটা দোচালা থাকার ঘর, একটা ছাপরা রান্নাঘর—দাদা সাবুদিকে ওই বাড়িতে তুলে দিল। দাদা প্রকৃত গেরস্তলোক—সে তো গেরস্তালিই বোঝে, সাবুদিকে কয়েকটা হাঁস-মুরগি, দুটো ছাগল, একটা দুধেল গাই কিনে দিল; যাতে করে দিদি নিজের খোরপোশটা অন্তত জোগাড় করতে পারে। সাবুদি সব পেরেও ছিল। তিন মাস পর্যন্ত দাদি চাল-ডাল-শাক-সবজি—সব পাঠাত, এরপর আর পাঠাতে হয়নি। সাবুদি পুরোদস্তুর গেরস্তবউ হয়ে উঠেছিল। হাঁস-মুরগি পালন, শাকসবজি চাষ, গাইগরুর পরিচর্যা ও দুধ দোয়ানো—সাবুদি সব একহাতেই করত। দিদির সাহস ছিল, কারও সমালোচনার ধার ধারত না। বৈধব্যজীবনের শুরুতে সামান্য অস্বস্তি বোধ করলেও দাদার সহায়তায়, পথের সব বাধা কাটিয়ে উঠেছিল দিদি। একাকী সংসারে, বলা যায়, মোটামুটি সচ্ছলই ছিল সে। সমস্যা একটাই ছিল, বড় সমস্যাই, দিদি কথা বলত খুব কম। কথা বলতেই চাইত না।

আনোয়ার ভাই বেঁচে থাকতে বাড়িতে ডাকাতির পর দেশ ছাড়ার রাতে প্রশান্ত তালুকদার সাবুদির ঘরে এসেছিল। দু-চারটে কথাবার্তার পর সাবুদি যখন জানল, ওর বাবা-মা, বাড়ির সবাই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তখন সাবুদি বাবার গলা জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কেঁদেছিল, কিন্তু বাবাকে বলতে পারেনি—তোমরা কেন নিজের দেশ ছেড়ে পরদেশে চলে যাবে, সেই সুযোগও ছিল না; বাবা-মাকে ছেড়ে চলে এসেছিল আনোয়ারের কাছে। মা-বাবা দেশ ছেড়ে চলে গেলেও এই বাংলাদেশ, নিজের জন্মভূমি, আনোয়ারের জন্মভূমি—এটাই তো তার নিজের পরিচয়। সাবুদির মাথায় যখন এই ভাবনা, এই সব মান-অভিমান, এই সব রাগ ও ক্রোধ বোধের দুয়ারে আঘাত হানছিল, সাবুদির মাথায়-মগজে পড়ছিল এলোপাতাড়ি কুঠারাঘাত, তখন এক রাতে, এটা অন্তত আনোয়ার ভাই নিহত হওয়ার বছরখানেক পরে, সাবুদি তখন যেভাবেই হোক, বাড়িটি যেভাবেই পাক, নিজের বাড়িতে সংসার পেতে বসেছে, দিদির ঘরের দরজায় আবার দুটো মৃদু টোকা পড়ল। প্রশান্ত তালুকদার এসেছে!

‘সাবু, মা সাবু…।’

‘বাবা, আমি বুঝে ফেলেছি তুমি এসেছ। তোমার গলার স্বর তো আমার আজন্ম চেনা। তুমি হঠাৎ বাংলাদেশে?’

‘তোর জন্যই এসেছি।’

‘আমার জন্য।’

‘সব তো জানি। আনোয়ার খুন হয়েছে। ম-লের গড়ে দেওয়া বাড়িতে থাকিস।’

‘তাতে কি, বাবা?’

‘তোর মা তোর জন্য কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে গেল। চল, এই উঠুলি বাড়িতে পড়ে থাকার চেয়ে নিজের মায়ের কাছে চল।’

‘বাবা, তুমি নিশ্চয়ই জানো, মা আর মাতৃভূমি—কেউ কারও চেয়ে ছোট না। এই রসুলপুর, এই বাংলাদেশ, এটা আমার মাতৃভূমি। এই গ্রাম, এই দেশ শুধু আমার মাতৃভূমি নয়, আনোয়ারেরও মাতৃভূমি। আনোয়ারের মাতৃভূমি ছেড়ে আমি কোথায় যাব, বাবা? তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো। মাকেও বলো, সে যেন আমাকে ক্ষমা করে দেয়।’

দাদা বেঁচে থাকতে দাদাই সাবুদির দেখভাল করত। বাড়ির বছর কড়ালে কামলা রহিজ দিদির বাজার-সদাই, পালানের শাকসবজি, হাঁস-মুরগির ডিম বিক্রি করে দিত। আনছের পাইকার দুধ নিয়ে যেত বাড়িতে এসে। ১৯৭৯ সালের ১৫ জুলাই দাদা মারা গেল, তখন আমার বয়স আর কত, বড়জোর বারো, এইটে পড়ি, তারপরও স্বয়ংক্রিয়ভাবেই যেন সাবুদিকে দেখভালের দায়িত্ব আমার ওপর এসে পড়ল। দিদির বাড়ি তো আমাদের বাড়ির কাছেই, মাঝখানে শুধু একটা আম-কাঁঠালের বাগান, স্কুলের সময়টুকু বাদ দিয়ে সকালে-বিকেলে বেশ কিছু সময় দিদির কাছেই থাকতাম। কোনো কোনো দিন অনেক রাত পর্যন্তও থেকেছি। সাবুদি ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছিল। ইংরেজিতে খুব ব্রিলিয়ান্ট ছিল। আমাকে ইংরেজি গ্রামার দেখিয়ে দিত। বেশি রাত হলে মা এসে আমাকে নিয়ে যেত বাড়িতে। এভাবেই চলছিল। কোনো সমস্যা ছিল না। গোল বাধল আমি এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর। তখন আমি যুবক হয়ে উঠেছি। সাবুদি আমার চেয়ে অন্তত পনেরো বছরের বড়। তারপরও গাঁয়ে কানাঘুষা শুরু হলো—মণ্ডলের নাতি একটা কেলেঙ্কারি না করে ছাড়বে না। দিনরাত ওই বাড়িটায় পড়ে থাকে।

কথা বাতাসে ভাসে। বাড়ির বেড়া যতই শক্ত ও পরিপাটি হোক, ঘরের বেড়া যতই নিশ্ছিদ্র হোক, বাতাস ঢুকবেই। বাতাসে ভর করে ঢুকবে কথা। গাঁয়ে যে সাবুদি আর আমাকে নিয়ে কানাঘুষা শুরু হয়েছে, কথা উঠছে চকে কামলা-জামলাদের আড্ডায়, এবাড়ি-ওবাড়ির মেয়েমহলের আড্ডায়; এই কথা সাবুদির কানেও আসে। সাবুদি এমনিতেই কথা বলে কম, কথা বলার জন্য তো মানুষের প্রয়োজন, সে কারও বাড়িতে যায় না, এমনকি আমাদের বাড়িতেও আসে কদাচিৎ, তার বাড়িতেও কেউ আসে না, কথা বলবে কার সাথে? কথা যা টুকটাক বলে, আমার সাথেই। তখন বাইরের কানাঘুষা তার কানে আসার পর আরও কঠিন নির্বাক হয়ে গেল। আমার সাথেও কথা বলে না। আমি আগের মতোই আসি, যাই, আমাকে শরিষার তেল দিয়ে চানাচুর-মুড়ি মেখে খেতে দেয়, কিন্তু কথা বলে না। একটা দমবন্ধ পরিবেশ। আমি বুঝি সাবুদি কেন কথা বলে না, কিন্তু আমি ওই প্রসঙ্গটা তুলে কথা বলব—সেই সাহসও পাই না। এক রাতে আমি সাবুদির ঘরে ঢুকে ওর বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসেছি, দিদি চুপচাপ ঘরের দরজা বন্ধ করে আমার কাছে এল, নিজের দুই হাত দিয়ে আমার দুই হাত ধরে আমাকে দাঁড় করাল। আমি তখন মাথায় সাবুদিকে খানিকটা ছাড়িয়ে গেছি। দিদি বলল, ‘সুমিত, বাইরে কেলেঙ্কারি রটছে, ঘরের ভেতর কেলেঙ্কারি করলে দোষ কী? তুই তো আনোয়ারের প্রতিভূ, আয় তোকে একটু আদর করি।’

আমি আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না—আমি কী শুনলাম! সাবুদি কী বলল? দিদি তখন আমাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে আমার ঠোঁটে, নাকে, চোখে উন্মাদের মতো চুমু খাচ্ছিল। আমি জড়বৎ দাঁড়িয়ে থাকলাম। একসময় সাবুদির ঝড় থামল। তারপর করল কী, বুকের কাপড় সরিয়ে ব্লাউজের বোতাম খুলে ফেলল। আমি ওর বুকের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। চোখ বুজে ফেলেছি। সাবুদি বলল, ‘দূর বোকা ছেলে। চোখ বুজেছিস কেন? মায়ের বুকের দিকে তাকাতে লজ্জা কিসের?’

মা!

‘চোখ খোল’, সাবুদি বলল, ‘যা বলি মন দিয়ে শোন। আনোয়ার বেঁচে থাকলে তোর মতো আমার একটা ছেলে থাকতে পারত। সেই ছেলে আমার স্তন চুষে দুধ খেত। তুই আমার ছেলে। আয়, আমার স্তন চুষে দুধ খা। আমাকে শান্তি দে।’ সাবুদি ওর স্তন আমার মুখে তুলে দিল। আমি স্তন চুষতে চুষতে নবজাতকের মতো ‘ওয়া ওয়া’ করে কেঁদে ফেললাম।’

সাবুদির মন যে কতটা বিক্ষিপ্ত ছিল, তা ওর স্ববিরোধী আচরণ দেখে অনুমান করা যায়। একবার আমাকে আনোয়ার ভাইয়ের প্রতিভূ বলল, পরক্ষণেই আমাকে নিজের ছেলে বানিয়ে আমার মুখে তুলে দিল ওর স্তন। ঘটনা যা-ই ঘটুক, যেভাবেই ঘটুক, সাবুদির সেই চুমুর ঘ্রাণ, চুমুর আস্বাদ, ওর স্তন চোষার অনুভূতি এই পঞ্চাশ পার করে আসা বয়সেও আমাকে আবেগাপ্লুত করে, উদ্বেলিত করে।

রতনরা আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। রতন ফোন করে জানিয়েছিল সাবুদির মৃত্যুসংবাদ। দিদির লাশের সৎকার হিন্দুশাস্ত্রমতে নাকি মুসলিম রীতিতে হবে—এই সিদ্ধান্ত দেওয়ার মালিক যেন সুমিত জহির। রতন, দুলাল, বাদল, যতীশকে আমিই দিদির কাছে থাকতে বলেছিলাম। আমার মন বলছিল, আজ রাতে বুদ্ধপূর্ণিমা, দিদি তো আগেই আমাকে বলেছে, কোনো এক বুদ্ধপূর্ণিমার রাতে সে দেহত্যাগ করবে, তো, আজকের রাত আর দিদির কাটবে না। চলে যাবে। আমার অফিসে জরুরি একটা কাজ ছিল। যেতেই হবে। তাই ওদের দিদির কাছে থাকতে বলেছিলাম। ওরা ছিল। ওরা চারজনই কায়স্থবাড়ির ছেলে, তবে জাতপাতের শুচিবাইমুক্ত। রতন আগেও আমার সাথে সাবুদির ঘরে গেছে। দিদির গল্প শুনে মুগ্ধ হয়েছে।

হ্যাঁ, সুমিত জহির জানে সাবুদির লাশ চিতায় তুলে দাহ করতে হবে। দিদির এটাই অভিপ্রায়।

সাবুদির ঘরে রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি আছে। পাথরের তৈরি। ঘরে গীতা আছে, রামায়ণ-মহাভারতও আছে। এসব আনোয়ার ভাই নিজেই নাকি কিনে দিয়েছিল দিদিকে। তাকে যেদিন বাড়িছাড়া করা হয়, তার ট্রাংক-স্যুটকেস নয়, কাপড়চোপড় নয়, রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি আর গীতা-রামায়ণ-মহাভারত পোঁটলায় বেঁধে নিয়ে এসেছিল। সে কলেমা পড়ে সাবিত্রী তালুকদার থেকে ফাতেমা বানু হয়েছিল, কিন্তু ওই পর্যন্তই, নামবদল মাত্র, বিশ্বাসের কোনো বদল ঘটেনি—আমি জানি। তারপরও এবার সাবুদি বুদ্ধপূর্ণিমার আগে আগে যখন খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল, আমার মনে হলো, দিদিকে কথাটা জিজ্ঞেস করা দরকার—কী মতে তার লাশের সৎকৃত্য করব। এক রাতে সাবুদির মাথার কাছে বসে আছি, দিদির চোখ বোজা, তবে ঘুমিয়ে যে পড়েনি, তা বোঝা যায়। আমি দিদির মাথায় হাত রেখে বললাম, ‘সাবুদি, একটা কথা বলতাম।’

দিদি চোখ খুলল। দিদির ঠোঁটে দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো একফালি সরু হাসি। বলল, ‘বল। নির্ভয়ে বল।’

‘তোমার মৃত্যুর পর কী উপায়ে লাশের সৎকৃত্য করব।’

‘আমাকে চিতায় তুলে দিস।’

সাবুদির শবযাত্রা বাড়ি থেকে বেরোনোর পরপরই বেহারাবাড়ির মদনসাধু আমার হাতে দারুর বোতল ধরিয়ে দিয়েছিল। এটাই রীতি। হিন্দু শ্মশানবন্ধুদের হাতে হাতে দারুর বোতল। মদনসাধু জানে, সুমিত জহির দারুপানে অভ্যস্ত, তাই আমার হাতেও বোতল দিয়েছিল। হিন্দু শ্মশানবন্ধুরা এক ঢোঁক করে দারু খায় আর মুখে বোল তোলে—‘হরিবোল, বোল হরি…।’ আমি সবার পেছনে। আমার বোতলের দারু তলানিতে ঠেকেছে। আমরা যতই সুনন্দার টোকের কাছাকাছি হই, আমার চোখে পড়ে—চাঁদ নাচতে নাচতে নিচে নেমে আসছে। এ তো দেখছি আজব ঘটনা! এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কে কবে চাঁদের এমন নৃত্য দেখেছে। চাঁদ কি দারু খেয়েছে নাকি? দারুর প্রভাবে নাচছে। আর আমি কি একাই চাঁদের এই নাচ কিংবা নৃত্য দেখছি, নাকি অন্য শ্মশানবন্ধুরাও দেখছে। ‘হরিবোল, বোল হরি’ আর খোল-করতালের সুরধ্বনি যত ঝংকার তুলছে, চাঁদের নাচের গতিও ততই বাড়ছে। আকাশ-বাড়ি ছেড়ে ধেয়ে নামছে নিচের দিকে। শবযাত্রা টোকে পৌঁছে গেল। আমরা পৌঁছানোর আগেই সাবুদির চিতা সাজানো শেষ হয়েছে। ধূপ, কেরোসিনের টিন, দেশলাই প্রস্তুত। দিদির মুখাগ্নি করবে তার ছেলে সুমিত জহির। এই সময় চাঁদ নাচতে নাচতে এসে আমার হাতের তালুতে বসে পড়ল। হাতের এই তালু কি করতল, করতলই হয়তো অধিক বিশুদ্ধ শব্দ, যেখানে চাঁদ এসে বসেছে; তা যা-ই হোক, সেটি কি আমার, নাকি রাতের? আমি আমার হাতের তালু খুঁজতে লাগলাম।

মদনসাধু আমার কাছে এসে বলল, ‘দাদা, আপনের বোতল তো খালি। আরেক বোতল দিই?’