খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ মে ২০২৫
প্রকৃতির ক্রমবর্ধমান রূপ পাল্টে যাচ্ছে। আগের মতো শুধু বৃষ্টি বা ঝড় নয়, এখন আকাশে মেঘ জমলেই মানুষের মনে ভর করে এক অজানা আশঙ্কা—বজ্রপাতের। বিশেষ করে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের এই সময়টাতে মাঠে থাকা যেন জীবন হাতে নিয়ে হাঁটার সমান। ঘরে-বাইরে, শহরে-গ্রামে—সবখানে দেখা দিচ্ছে এই বিপজ্জনক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। চলতি বছর এপ্রিল থেকে ১৮ মে পর্যন্ত, শুধু গত দেড় মাসেই বজ্রাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪০ জন। আরও অনেক মানুষ আহত হয়েছেন, নষ্ট হয়েছে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, পুড়েছে মালামাল।
নিহতদের তালিকায় রয়েছেন কৃষক, শিক্ষার্থী, জেলে, বিজিবি সদস্যসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। বিশেষ করে যারা খোলা মাঠে বা কৃষিকাজে ব্যস্ত ছিলেন, তাদেরই প্রাণহানি ঘটছে বেশি। প্রশ্ন উঠছে—কেন এত বজ্রপাত? আমরা কী করব এই মৃত্যুঝুঁকি ঠেকাতে?
বজ্রপাত কেন বাড়ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাতের পেছনে রয়েছে কিউমুলোনিম্বাস নামের বিশেষ ধরনের বজ্রমেঘ, যা গরম ও ঠাণ্ডা বাতাসের সংঘর্ষে সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বজ্রপাতের জন্য অত্যন্ত অনুকূল—দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস আসে, আর উত্তরে হিমালয় থেকে আসে ঠাণ্ডা বাতাস। এই দুটি বাতাসের সংঘাতে তৈরি হয় অস্থিতিশীলতা, যার ফলে সৃষ্টি হয় বজ্রমেঘ।
গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বা তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বেড়ে গেলে বজ্রপাতের সম্ভাবনা ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ দেশ।
আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, বজ্রপাত দেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে এখন মানুষের হাতে মোবাইল ও ইন্টারনেট থাকায় এমন সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অতীতে এসব ঘটনার সঠিক হিসাব বা কাউন্টিং হতো না। এখন প্রযুক্তির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে বজ্রপাতের পরিমাণেও। ২০১১ থেকে ২০২১ পর্যন্ত দশকে তাপমাত্রা বেড়েছে, যা আগের দশকগুলোর তুলনায় বেশি। এর ফলে বজ্রপাতের ঘটনা ও প্রাণহানিও বাড়ছে।
কী করা উচিত?
বজ্রপাতের মতো দুর্যোগে প্রযুক্তির পাশাপাশি সচেতনতাও জরুরি। আবহাওয়া অফিস বলছে, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত বজ্রপাতের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়টায় কালবৈশাখীর ঝড় ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়। তাই আকাশে কালো মেঘ দেখলেই খোলা মাঠ, উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটির নিচ থেকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া উচিত।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বজ্রপাতের সময় ঘরের ভেতরে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ। জানালা-দরজা বন্ধ রাখতে হবে, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকতে হবে। ধাতব বস্তু, খোলা জলাশয় এবং কংক্রিটের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলাও প্রয়োজন।
পরিশেষে, প্রাকৃতিক দুর্যোগকে পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও, সচেতনতা ও প্রস্তুতি মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। বজ্রপাতকে শুধু দৈব ঘটনা বলে ভুলে গেলে চলবে না। বৈশ্বিক উষ্ণতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্থানীয় আচরণের প্রভাবে এর মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। তাই ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ ও জনসচেতনতা জরুরি। আকাশে যখন মেঘ জমে, তখন যেন আর কারও মাথার ওপর মৃত্যু না নামে—সেই চেষ্টাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
খবরওয়ালা/আরডি