খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 17শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩২ | ৩১ই মে ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে আগামী তিন মাস পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বন বিভাগ। ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
শনিবার (৩১ মে) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেডএম হাছানুর রহমান। তিনি জানান, খুলনা রেঞ্জের অন্তর্গত সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে মাইকিং করে স্থানীয়দের এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি বনের ভেতরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ সময়সীমার মধ্যে কোনো বনজীবীকে অনুমতিপত্র (পাশ) দেওয়া হবে না এবং পর্যটকদেরও সুন্দরবনে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তারা জানান, প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনের ২৫১ প্রজাতির মাছ ডিম ছাড়ে। বিশেষ করে বর্ষাকালে এই প্রক্রিয়া প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে ঘটে থাকে। তাই এই সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখলে প্রাকৃতিকভাবে মাছের পরিমাণ বাড়ে এবং বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায়।
এদিকে নিষেধাজ্ঞার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের বনজীবী হিসেবে পরিচিত জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা কিভাবে সংসার চালাবেন- তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় তিন মাস তাদের কষ্টের মধ্যে দিন পার করতে হবে বলে জানিয়েছেন কয়রার অনেক বনজীবীরা।
শনিবার সকালে সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীর তীরে গিয়ে দেখা যায়, সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে ফিরে আসা শতাধিক মাছ ধরা নৌকা নদীর তীরে বেঁধে রাখা হয়েছে। কেউ কেউ আবার নৌকা মেরামত করার জন্য বেড়িবাঁধের রাস্তার ওপর উঠিয়ে রেখেছেন।
কয়রার বনজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ও মধু আহরণ করে আমাদের সংসার চলে। ৩ মাস (জঙ্গল) সুন্দরবন বন্ধ থাকবে। এলাকায় তেমন কোনো কাজ কর্ম নাই, ভাবছি কিভাবে স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে সংসার চালাবো। ’
সুন্দরবনসংলগ্ন শাকবাড়িয়া নদীর তীরবর্তী পাথরখালী গ্রামের জেলে শফিকুল ইসলাম বলেন, আবার ১ জুন থেকে ৯২ দিনের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে। বন্ধের সময় সাগরে মাছ ধরা জেলেদের সরকারি সহায়তা করা হলেও সুন্দরবনের জেলেদের কিছুই দেয় না। এরমধ্যে সবকিছুর দাম বাড়তি। বন্ধের সময় সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য না করলে আমাদের সামনের দিনগুলো খুব কষ্টের মধ্যে যাবে।
সুন্দরবনের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম সাহিদ বলেন, ১ জুন থেকে সুন্দরবনের সব নদী ও খালে মাছ ধরা বন্ধের পাশাপাশি পর্যটক প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বন্ধ করা হয়েছে সুন্দরবনে প্রবেশের সব ধরনের পাশ-পারমিট। এ সময় বন্য প্রাণী শিকার ও মাছ ধরা বন্ধে কঠোর অবস্থানে থাকবে বন বিভাগ।
কয়রা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কয়রায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ১৩ হাজার ৫২৬ জন।
অবশ্য স্থানীয় বনজীবীরা বলছেন, কয়রায় জেলেদের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। ভৌগোলিক কারণে কয়রার ৫টি ইউনিয়ন মানুষ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। কয়রায় অন্তত ৫০ হাজার জেলে পরিবারের বসবাস, যারা বংশপরম্পরায় বনজীবী। তারা সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া আহরণ করে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস কর্মকর্তা সমীর কুমার সরকার বলেন, অনেকে প্রকৃত জেলে কিন্তু তাদের কার্ড না থাকায় আমরা উপকারভোগীর আওতায় আনতে পারছি না। যারা প্রকৃত জেলে না অথচ জেলে কার্ড আছে আমরা তাদের যাচাই-বাছাই করে কার্ড বাতিল করে প্রকৃত জেলেদের উপকারভোগীর অন্তর্ভুক্ত করবো। এ ব্যাপারে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক এসিএফ মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ইতোমধ্যে সব স্টেশনে পাশ-পারমিট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। খুলনা রেঞ্জের অধীনস্থ এলাকায় টহল কার্যক্রম বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনে ১ জুন থেকে ৯২ দিনের জন্য সব ধরনের পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি বন বিভাগের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। জেলে বাওয়ালিদের বিকল্প খাদ্য সহায়তার জন্য সাগরের জেলেদের জন্য মাসে কিছু সহায়তা করা হচ্ছে। আমরা বনজীবীদের মাসে ৪০ কেজি চাল দেওয়ার প্রস্তাব করে একটা তালিকাও মৎস দপ্তরে পাঠিয়েছি।
খবরওয়ালা/এন