খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২ জুলাই ২০২৫
সেদিন ছিল এক সোমবার। আষাঢ়ের কালো মেঘে ঢাকা আকাশ, বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে ভিজে যাচ্ছিল শহরের পথঘাট। বাতাসে ছিল এক স্নিগ্ধ শীতলতা, আর ঠিক সেই সময়ে সুরের এক মন্দিরে প্রবেশ করলেন বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন।
তাঁর কণ্ঠে ‘জন্ম আমার ধন্য হলো’, ‘ও আমার বাংলা মা তোর’, ‘ও মাঝি নাও ছাইড়া দে’, কিংবা ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য’-এর মতো গানগুলো আজও বাঙালির রক্তে দোলা জাগায়। আজও তাঁর গায়কিতে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বয়স তাঁর ৭০, কিন্তু কণ্ঠের কাছে এই সংখ্যা কেবলই এক নিছক ব্যাপার। রোগ-শোক, দীর্ঘ পথচলা, জীবনের উত্থান-পতন – সবকিছু পেরিয়েও যখন তিনি গান ধরেন, মনে হয় যেন সময় থমকে দাঁড়িয়েছে। তাঁর কণ্ঠে এমন এক জাদু আছে, যা সময়কে বশ করে নেয় এবং হৃদয়কে এক অচেনা শিহরণে ভরিয়ে তোলে।
মগবাজারের দিলু রোডের রেকর্ডিং স্টুডিওতে যখন তিনি এলেন, চারপাশে এক অন্যরকম আবেশ ছড়িয়ে পড়ল। পরিচিত সেই কোকিলকণ্ঠ যখন বেজে উঠল, মনেই হচ্ছিল না তিনি সত্তর পেরিয়েছেন। বরং মনে হচ্ছিল, কোনো এক তরুণী গান ধরেছে, যার কণ্ঠে মায়া, মমতা আর গভীর প্রেম। গাইছিলেন ‘প্রাণের বাংলাদেশ’। গানটি লিখেছেন আরিফ হোসেন বাবু, আর সুর করেছেন রোহান রাজ। সাবিনা ইয়াসমিন যেন গানে গানে বাংলাদেশের আত্মাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিলেন। এক অন্তরা শেষ করেই থেমে বললেন, “এই লাইনটা মনমতো হয়নি, আবার দেই।” সেই একাগ্রতা, সেই নিষ্ঠা – এ যেন শিল্পের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম প্রেমেরই প্রকাশ। একটানা গাইছিলেন, আবার থেমে যাচ্ছিলেন। সংশোধন করছিলেন, আবার দরদ দিয়ে গাইছিলেন। তাঁর সেই মুহূর্তগুলো দেখে মনে হচ্ছিল, শিল্পী নিজেই যেন নিজের সবচেয়ে বড় সমালোচক।
যখন তিনি গাইছিলেন, তখন চারপাশটা ছিল একদম নিস্তব্ধ। রেকর্ডিং স্টুডিওর প্রতিটি দেয়াল যেন তাঁর কণ্ঠে মুগ্ধ হয়ে স্থবির হয়ে গিয়েছিল। তাঁর কণ্ঠে ফুটে উঠল বাংলাদেশের নদী, মাঠ, প্রান্তর, মানুষের দুঃখ-সুখ, প্রেম-বিরহ। ছেলেবেলায় যেমন রুপালি পর্দার নায়িকারা কল্পনায় হেঁটে বেড়াতেন, তেমনই আমাদের কল্পনার পর্দায় হেঁটে বেড়ালেন সাবিনা ইয়াসমিনের সুরেলা কণ্ঠ। কথায় বিনয়, চোখে ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু কণ্ঠে ছিল সজীবতা। মনে হচ্ছিল, তিনি আমাদের খুবই চেনা একজন মানুষ, যার সুরে আছে হাজারো অচেনা অনুভূতির গুঞ্জন।
গানে দরদ নেই, আবেগও নেই
টানা ৩০ মিনিটে রেকর্ডিং শেষ করলেন সাবিনা ইয়াসমিন। এসে বসলেন পাশে। তিন হাত দূর থেকে এই কালজয়ী শিল্পীকে দেখার অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ। এসেই জিজ্ঞেস করলেন, “সবাই ভালো আছো তো?” এরপর ধীরে ধীরে তিনি গল্পের ঝাঁপি খুললেন। প্রথমেই জানতে চাওয়া হলো, এত দরদ দিয়ে গানটায় কণ্ঠ দিলেন, কিন্তু এখনকার গানে আমরা এমন দরদ পাই না কেন? প্রশ্ন করতেই তিনি চাতক পাখির মতো তাকালেন।
একটু ভেবে বলতে লাগলেন, “লাস্ট একটি ছবির গানের সুর করেছিলাম। সেই সিনেমায় এই সময়ের একজন কণ্ঠশিল্পীকে আমি গানটি গাওয়ার ব্যাপারে এক্সপ্রেশনও বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। সে সিনেমার পরিচালক যিনি, তিনিও শিল্পীকে বলে বলে দরদ ও এক্সপ্রেশনটা পুরোপুরি আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বিষয়টি এমন কেন হবে?”
তিনি প্রশ্ন তুললেন, শিল্পীরা কেন এটা নিয়ে পরিশ্রম করছেন না? কেন তারা নিজে থেকে রেওয়াজ বা অনুশীলন করছেন না? “সাদামাটা গেয়ে গেলে তো আর ফিল্মের গানের কিছু হলো না। এখন সেটাই হচ্ছে। সাদামাটাভাবেই যেন সবাই গাইছেন। ফলে এখনকার গানে দরদটা নেই, এক্সপ্রেশন নেই, আবেগও নেই, কোনো কিছুই যেন নেই।” বোঝা গেল, এই সময়ে মেধাবী শিল্পী থাকলেও সেই মেধা বিকাশের চেষ্টা না থাকায় কিছুটা হলেও মর্মাহত এই গায়িকা।
কেন গানে দরদ নেই, সে বিষয়ে তিনি নিজেই ব্যাখ্যা দিলেন: “গান যদি এক লাইন এক লাইন করে গাওয়া হয়, একটা একটা শব্দ করে যদি রেকর্ডিং করা হয়, তাহলে গানে দরদ কীভাবে আসবে?” তিনি আরও যোগ করেন, “এখন ডুয়েট গানেও শুনি একজন আরেকজনকে দেখেন না। অথচ আমরা যখন ডুয়েট করেছি, তখন একসঙ্গে ভয়েস দিতাম। প্রতিযোগিতা চলত কে কার চেয়ে ভালো গাইতে পারে।” একটা উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “‘সব সখীরে পার করিতে নেব আনা আনা’ – এই গানটা আব্দুল আলীম ভাইয়ের সঙ্গে গাইতে গিয়ে তো আমি ভয়ে শেষ। পরে আলীম ভাই সাহস দিলেন। বেশ কয়েকবার আমাকে অভয় দিলেন। পরে গাইলাম। বলতে গেলে বিখ্যাত মানুষের সামনেও আমার পার্ট তার চেয়ে কীভাবে ভালো হয়, সে প্রতিযোগিতা ছিল। একইরকম ঘটনা ঘটেছিল কিশোর কুমারের সঙ্গে গাওয়ার সময়। অথচ এখন সেটা অনুপস্থিত।
সূত্র: সমকাল
খবরওয়ালা/টিএস