খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: শনিবার, ১২ জুলাই ২০২৫
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) ক্যাম্পাসে রামদা হাতে আলোচনায় আসা দৌলতপুর থানা যুবদলের সহসভাপতি মাহবুবুর রহমান মোল্লা গতকাল শুক্রবার (১১ জুলাই) দুপুরে নগরীর দৌলতপুরে নিজ বাড়ির সামনে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হয়েছেন। একাধিক গুলির পর তাঁর পায়ের রগও কেটে দেওয়া হয়।
গতকাল দুপুরে এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই খুলনা-যশোর মহাসড়ক অবরোধ করে বিএনপি নেতাকর্মীরা। তারা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ ও মিছিল করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে মাহবুবুর রহমান মোল্লা মহেশ্বরপাশা নিজ বাড়ির সামনে সদ্য কেনা প্রাইভেটকার পরিষ্কার করছিলেন। এ সময় একটি মোটরসাইকেলে আসা তিন ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। মাহবুব দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে তারা পেছন থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। একটি গুলি মাহবুবের মাথায় এবং একাধিক গুলি তাঁর বুক, ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে লাগে। গুলি খেয়ে তিনি রাস্তার পাশে পড়ে গেলে দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেল থামিয়ে নেমে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাঁর পায়ের রগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তারা মোটরসাইকেল চালিয়ে পালিয়ে যায়।
ওই সময় মসজিদে জুমার নামাজ চলায় সড়কে লোকজনের আনাগোনা কম ছিল। সুরতহাল রিপোর্টে মাহবুবের শরীরে ৯টি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। মাহবুবের দুই স্ত্রী ও দুই মেয়ে রয়েছে।
গতকাল মহেশ্বরপাশা পশ্চিমপাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, বাড়ির সামনে উৎসুক মানুষের ভিড়। পুলিশ, পিবিআই ও সিআইডি সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করছেন। বাড়ির প্রধান ফটক ও দেয়ালে একাধিক গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থল থেকে সাতটি গুলির খোসা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে সিআইডি।
বাড়ির ভেতরে মাহবুবের দুই মেয়ে, বোন ও দ্বিতীয় স্ত্রী আহাজারি করছিলেন। নিহতের একমাত্র বোন শান্তা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “দলের জন্য কত কষ্ট করেছে। গুলি খেয়েছে, পালিয়ে বেড়িয়েছে। এখন ভালো সময়ে আমার ভাই চলে গেল।”
প্রত্যক্ষদর্শী এক যুবক জানান, তিনি মাহবুবের সঙ্গে গাড়ি পরিষ্কার করছিলেন। এ সময় তিন ব্যক্তি মোটরসাইকেলে আসে, যাদের একজনের মাথায় হেলমেট ছিল। তারা নেমেই গুলি শুরু করে। মাহবুব বাড়ির দিকে দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি করা হয়। গুলির শব্দে তিনি মাথা উঁচু করলে তাকে লক্ষ্য করেও গুলি করা হয়, তখন তিনি দৌঁড়ে পালিয়ে যান।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর আতাহার আলী জানান, যুবকরা মোটরসাইকেল চালিয়ে তেলিগাতির দিকে চলে গেছে। তথ্য পেয়ে পুলিশ ওই এলাকায় অভিযান শুরু করেছে। আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে এবং প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েও কাজ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, মাহবুবের বিরুদ্ধে মাদকসহ আটটি মামলা ছিল। বিষয়গুলো মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে।
পুলিশ সূত্র ও স্থানীয়রা জানান, মহেশ্বরপাশা, তেলিগাতিসহ আশপাশের এলাকায় চরমপন্থী ও সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেশি। মাহবুব দলে নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন। তবে ৫ আগস্টের পর এলাকায় তার বেপরোয়া আচরণ, আধিপত্য বিস্তার, মাদক ও জমি বিক্রির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আলোচনা আছে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে বিএনপির একাংশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুর, গত বছরের আগস্ট মাসে বিএল কলেজ সড়কে বিএনপি অফিস ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা এবং কুয়েটে রামদা হাতে অংশ নেওয়ার বিষয় নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা চলছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) তাজুল ইসলাম বলেন, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারসহ কয়েকটি বিষয় মাথায় নিয়ে আমরা তদন্ত করছি।
বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা জানান, মাহবুব বিএনপির নিবেদিত কর্মী ছিলেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর তিনি বদলে যান। কুয়েটের ঘটনায় মামলা হলেও পুলিশ মাহবুবকে গ্রেপ্তার করেনি। ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে—এমন ইঙ্গিত করে ফেসবুকে প্রচারণাও চালাচ্ছে বিএনপি নেতাকর্মীরা।
খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা বলেন, খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। পুলিশ কোনো প্রতিকার করতে পারছে না। আগের হত্যার ঘটনায় পদক্ষেপ নিলে মাহবুবকে খুন হতে হতো না। আমরা অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার এবং খুলনা পুলিশে বড় রদবদলের দাবি জানাচ্ছি।
খবরওয়ালা/টিএস