খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: শনিবার, ১২ জুলাই ২০২৫
এসএসসি ও সমমানের ফলাফল গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে। এবার জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন পরীক্ষার্থী। ফলাফল নিয়ে তাৎক্ষণিক আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও, ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে। কারণ, এখন একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির পালা, আর পছন্দের প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর মোর্চা আন্ত শিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে যে, একাদশ শ্রেণিতে আসনসংখ্যার কোনো সংকট নেই। তারা বলছে, যে পরিমাণ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হবে, দেশের কলেজগুলোয় তার দ্বিগুণ আসন খালি থাকবে। তবে মূল সংকটটি হলো পছন্দের মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া নিয়ে। দেশে কলেজের সংখ্যা বাড়লেও, মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বাড়েনি। ফলে এবারও জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা দেশের নামিদামি তিন শতাধিক কলেজ ঘিরেই তীব্র ভর্তিযুদ্ধে নামবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে সাধারণ কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৯ হাজার ৩১৪টি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট ২৭ লাখ ৬৮ হাজার ৩৪২টি আসন রয়েছে। বিপরীতে, এবার এসএসসিতে মোট ১৩ লাখ তিন হাজার ৪২৬ জন পরীক্ষার্থী পাস করেছে। এর অর্থ হলো, যদি পাস করা সব শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়, তার পরও ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৯১৬টি আসন খালি থাকবে। সাধারণত, প্রতিবছর এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশ আর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয় না, সেক্ষেত্রে খালি আসনের সংখ্যা আরও বাড়বে।
বোর্ডভিত্তিক আসন সংখ্যা
বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের অধীন কলেজগুলোর আসন সংখ্যার চিত্র নিম্নরূপ:
ঢাকা শিক্ষা বোর্ড: ১ হাজার ৭২টি কলেজে ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩৬৯টি আসন।
রাজশাহী বোর্ড: ৭৫৫টি কলেজে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৯০০টি আসন।
কুমিল্লা বোর্ড: ৪৫৮টি কলেজে ২ লাখ ৫৯ হাজার ১৯০টি আসন।
যশোর বোর্ড: ৫৭৫টি কলেজে ২ লাখ ২০ হাজার ৯৩৯টি আসন।
চট্টগ্রাম বোর্ড: ৩০৫টি কলেজে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৪টি আসন।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ড: ৩৪৯টি কলেজে ১ লাখ ৭০ হাজার ৮৮০টি আসন।
সিলেট বোর্ড: ৩২২টি কলেজে ১ লাখ ৪১ হাজার ১৩৮টি আসন।
দিনাজপুর বোর্ড: ৬৬১টি কলেজে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৫৫৬টি আসন।
ময়মনসিংহ বোর্ড: ৩১১টি কলেজে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৬৭টি আসন।
মাদরাসা বোর্ড: ২ হাজার ৬৮২টি মাদরাসায় ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৪১টি আসন।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ড: ১ হাজার ৮২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১ লাখ ৯ হাজার ৬১১টি আসন।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক মো. রিজাউল হক গণমাধ্যমকে জানান যে, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে মিটিং হয়েছে এবং এ সপ্তাহে আরেকটি মিটিং হওয়ার কথা রয়েছে। এরপরই শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ভর্তি নীতিমালা জারি করা হবে। তিনি আশা করছেন, চলতি জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হবে এবং বুয়েট এই প্রক্রিয়ায় কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
অধ্যাপক রিজাউল হক আরও বলেন, একাদশ শ্রেণিতে যথেষ্টসংখ্যক আসন রয়েছে এবং পাস করা সব শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও কোনো সংকট হবে না; বরং দ্বিগুণসংখ্যক আসন খালি থাকবে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, সব শিক্ষার্থীই নির্দিষ্ট কিছু কলেজে ভর্তি হতে চায়। তিনি আশা করেন যে, এসএসসির ফলাফলের মাধ্যমে স্কুলগুলো যেমন একটি বার্তা পেয়েছে, তেমনি কলেজগুলোও তাদের মান উন্নয়নে চেষ্টা করবে। বোর্ডও শিক্ষার মান বাড়াতে এবং মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করতে চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
জানা গেছে, পাস করা প্রায় সব শিক্ষার্থীই রাজধানীর নির্দিষ্ট কিছু নামিদামি কলেজে ভর্তি হতে চায়। কিন্তু রাজধানীর পছন্দের ৩০টি কলেজে আসনসংখ্যা রয়েছে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার। এছাড়া, রাজধানীতে বেশকিছু স্কুলসংযুক্ত কলেজ রয়েছে, যেখানে সাধারণত ওই স্কুল থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরাই অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। ফলে বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য খুব কম সুযোগ থাকে।
রাজধানীর বাইরে বিভাগীয় ও জেলা শহরের দুই শতাধিক পছন্দের কলেজে সর্বোচ্চ লক্ষাধিক আসন রয়েছে। আর অর্ধশতাধিক পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠান ও স্বল্পসংখ্যক মাদরাসা শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে। সব মিলিয়ে এই মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩০০-এর আশপাশে, যেখানে মোট আসনসংখ্যা হতে পারে দুই লাখ।
এ বছর জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন পরীক্ষার্থী এবং জিপিএ ৪ থেকে ৫-এর মধ্যে পেয়েছে চার লাখ ৪৪ হাজার ৩৭৮ জন। এই মোট ছয় লাখ শিক্ষার্থী দেশজুড়ে পছন্দের ৩০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করবে, যা তুমুল প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে। সারা দেশের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ রাজধানীর কলেজগুলোয় পড়তে চায়, ফলে রাজধানীর কলেজগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। তবে সম্পূর্ণ ভর্তি প্রক্রিয়া অনলাইনে হওয়ায়, এসএসসি ও সমমানের নম্বর অনুযায়ী অর্থাৎ মেধার ভিত্তিতেই শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হবে।
রাজধানীর শীর্ষ কলেজগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু প্রতিষ্ঠানের আসন সংখ্যা নিম্নরূপ:
ঢাকা কলেজ: ১ হাজার ২০০টি
নটর ডেম কলেজ: ৩ হাজার ২৭০টি
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ: ১ হাজার ৭০৪টি
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ: ২ হাজার ৩৭৬টি
হলি ক্রস কলেজ: ১ হাজার ৩৩০টি
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ: ২ হাজার ২০০টি
শহীদ বীর-উত্তম লে. আনোয়ার গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ: ১ হাজার ১২০টি
ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ: ১ হাজার ১৪টি
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ: ১ হাজার ১৬৫টি
বিএএফ শাহীন কলেজ: ১ হাজার ২২০টি
ঢাকা সিটি কলেজ: ৩ হাজার ৭৬২টি
বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ পাবলিক কলেজ: ১ হাজার ৯৮০টি
ঢাকা কমার্স কলেজ: ৪ হাজার ৭০০টি
বাংলাদেশ নেভি কলেজ: ৯৫০টি
শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ: ৮৮০টি
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগের বছরগুলোর মতো এ বছরও চার্চ পরিচালিত রাজধানীর চারটি কলেজ—নটর ডেম কলেজ, হলি ক্রস কলেজ, সেন্ট জোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ—ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদন দিতে পারে। এই চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসতে হবে এবং এসএসসির জিপিএ ও ভর্তি পরীক্ষার ফলের সমন্বয়ে মেধার ভিত্তিতেই সুযোগ মিলবে।
খবরওয়ালা/টিএস