খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই ২০২৫
পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার রেশ না কাটতেই রাজধানীর গুলশানে ঘটেছে আরেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা, সমন্বয়ক পরিচয়ে প্রকাশ্য চাঁদাবাজি। ঘটনাটি সামনে আসার পর দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও আলোচনা। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবচিত্র ভিন্ন, চাঁদাবাজি চলছে নির্বিঘ্নে।
ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ অবস্থায় চরম বিরক্ত ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। চাঁদা না দিলে হুমকি, মব সন্ত্রাস এমনকি অপহরণ পর্যন্ত করা হচ্ছে। বিশেষত, সীমান্তবর্তী এলাকা টেকনাফে রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্ট চক্রের বেপরোয়া চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। দেশের প্রায় সব জেলাতেই নানা পরিচয়ে, বিশেষ করে ‘সমন্বয়ক’ পরিচয় ব্যবহার করে চলছে এমন কার্যক্রম।
এই পরিস্থিতিতে সোমবার (২৮ জুলাই) আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘চাঁদাবাজ যত বড়ই হোক, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
এর আগে গত শনিবার রাতে গুলশানে সাবেক সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদার টাকা নিতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের চার নেতা। তাঁদের মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক রিয়াদ নামের একজন গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রিয়াদ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং নিজ এলাকায় বিলাসবহুল বাড়িও নির্মাণ করছেন।
এই ঘটনার পর দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘পত্রিকায় দেখলাম পাঁচজন সমন্বয়কারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁরা জোর করে একজন সাবেক এমপির কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা আদায় করেছেন। এটা পড়ে বেদনায় একেবারে নীল হয়ে গেছি।’
ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় প্ল্যাটফর্মটির সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা নিজের সামাজিক মাধ্যমে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে লাইভে এসে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। মাঝে মাঝে কাঁদতেও দেখা যায় তাঁকে। তিনি বলেন, ‘জুলাই-আগস্ট সময়টা অন্যরকম হওয়ার কথা ছিল। দুঃখজনকভাবে সেটা অর্থ কামানোর যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।’
এ ঘটনার পরের দিন রবিবার রাতেই সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও শাখা কমিটিগুলো স্থগিত করা হয় এবং অভিযুক্তদের বহিষ্কার করা হয়।
গুলশান থানায় দায়ের করা মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৭ জুলাই রিয়াদসহ কয়েকজন শাম্মী আহমেদের বাসায় গিয়ে নিজেদের ‘সমন্বয়ক’ পরিচয় দিয়ে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। সেদিন বাসায় ছিলেন শাম্মী আহমেদের স্বামী সিদ্দিক আবু জাফর। ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁরা ১০ লাখ টাকা আদায় করেন। পরবর্তীতে বাকি টাকা নিতে গেলে পুলিশ তাদের হাতেনাতে ধরে ফেলে।
তবে এসব ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরও দেশের নানা এলাকায় একই ধরনের চাঁদাবাজি চলছেই। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর অনুযায়ী, ঝিনাইদহ, হবিগঞ্জ, বরিশাল, সিলেটসহ অনেক জায়গায় এখনো ‘সমন্বয়ক’ পরিচয়ে মানুষকে হুমকি দিয়ে টাকা আদায় করা হচ্ছে।
এর আগে, গত ৯ জুলাই পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে প্রকাশ্যে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ব্যবসায়ী মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে। ইট-পাটকেল দিয়ে পিটিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়। হত্যার আগে তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। চাঁদা না দেওয়াতেই এই বর্বর হামলা হয়। নিহতের বোন ১০ জুলাই কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন।
সব মিলিয়ে দেশজুড়ে ‘সমন্বয়ক পরিচয়ের’ নামে সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজির ঘটনা এক ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাস্তব পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
খবরওয়ালা/এমএজেড