এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: রবিবার, ৩ আগস্ট ২০২৫
আজ ৩ আগস্ট, কিংবদন্তি সাংবাদিক, অগ্রগামী রাজনীতিক এবং সাহসী সমাজ চিন্তক নির্মল সেনের জন্মদিন। তিনি ছিলেন গণমানুষের কণ্ঠস্বর, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের সহযাত্রী এবং সমাজতান্ত্রিক স্বপ্নের এক নিরলস পথিক।
নির্মল সেন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩০ সালের ৩ আগস্ট, গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ার দীঘিরপাড় গ্রামে। কৈশোরেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। কলেজজীবনে তিনি বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী গোপন সংগঠন ‘অনুশীলন সমিতি’র সদস্য হন। এই সময় থেকেই তার মধ্যে গড়ে ওঠে শোষণবিরোধী এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক চেতনা।
সাংবাদিকতার শুরু এবং সংগ্রাম
১৯৫৯ সালে তিনি দৈনিক ইত্তেফাক-এ সাংবাদিক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন। এরপর দৈনিক আজাদ, দৈনিক পাকিস্তান এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী কালে দৈনিক বাংলা পত্রিকায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। লেখার ভাষা ছিল প্রখর, যুক্তিনির্ভর এবং শ্রমিক শ্রেণির অধিকারের পক্ষে সোচ্চার।
তিনি একাধারে সংবাদপত্রে কলাম লিখতেন, অন্যদিকে বাম রাজনীতির বলিষ্ঠ মুখপাত্র ছিলেন। সাংবাদিকতার শৃঙ্খলা ও অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (BFUJ) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি কখনও আপস করেননি।
রাজনীতি ও সমাজবাদী সংগ্রাম
নির্মল সেন কেবল সাংবাদিক নন, ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিক। তিনি ‘শ্রমিক-কৃষক সমাজবাদী দলের’ (হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননের পর) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে, বন্দি জীবনে, কিংবা লেখনীতে— সর্বত্র তিনি এক অনমনীয় আদর্শের ধারক।
গ্রন্থসমূহ
নির্মল সেনের রচনাসমূহ তাঁর গভীর রাজনৈতিক চিন্তা ও সমাজ বিশ্লেষণের বহিঃপ্রকাশ। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—
পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ
মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র
বার্লিন থেকে মস্কো
স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই
আমার জীবনে একাত্তরের যুদ্ধ
এই বইগুলোতে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে।
বিদায় ও উত্তরাধিকার
৮ জানুয়ারি ২০১৩ সালে এই বিপ্লবী সাংবাদিক ও সমাজচিন্তকের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুতে দেশ হারায় এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর, প্রগতির এক অনলস কর্মী। আজ এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাই সেই মানুষটিকে, যিনি আজীবন লড়েছেন মানুষের মুক্তির জন্য।
তার জীবন ও সংগ্রাম আজও আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়—
স্বাধীন সাংবাদিকতা, শোষণহীন সমাজ এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, নির্মল সেন। আপনি থাকবেন আমাদের স্মরণে ও সংগ্রামে।
লেখক – সম্পাদক ও প্রকাশক ‘খবরওয়ালা’