খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ আগস্ট ২০২৫
তীব্র বিতর্কের মুখে সিলেট ছাড়ছেন বিদায়ী জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ। তাকে ঘিরে সিলেটে চলছে নানা জল্পনা। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কেন তিনি সাদাপাথর রক্ষা করতে ব্যর্থ হলেন? তার দায়িত্বকালেই সিলেটে বালু-পাথর লুটে রেকর্ড গড়া হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাট হয়েছে তার চোখের সামনেই। নির্বিচারে ধ্বংস হয়েছে পরিবেশ।
জনমনে হাহাকার তৈরি হলেও প্রশাসন ছিল প্রায় নিস্ক্রিয়। আর সব কিছুর দায় চাপানো হচ্ছে ডিসি মুরাদের ওপর। অভিযোগ উঠেছে, অতীতে কোনো আমলেই সিলেটে এমন হরিলুট হয়নি। এজন্য শুধু প্রত্যাহার নয়, তদন্তসাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।
এক বছর আগে সংকটকালে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব নেন মাহবুব মুরাদ। দায়িত্ব নিয়েই প্রথমে তিনি বালু-পাথর লুটে কঠোরতা দেখান। আর এই কঠোরতার মধ্য দিয়েই ধরা পড়ে যায় সব সিন্ডিকেট। তবে পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তাদের সঙ্গেই আঁতাত করে দেন তিনি। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দাবি, তিনি অন্তত ৫-৬টি বালুমহালের ইজারা দেন। শেষ পর্যায়ে ইজারা দেন কোম্পানীগঞ্জের বালুমহাল, যা গত বছরও ইজারা হয়েছিল। প্রায় ১০ কোটি টাকার বিনিময়ে এই ইজারা দেয়া হয়। স্থানীয়রা একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে আপত্তি জানালেও তিনি সেগুলো অগ্রাহ্য করেন। বিশেষ করে কালাসাদেক মৌজা বাদ দেয়ার অনুরোধও গৃহীত হয়নি। এই মৌজাটি সাদাপাথরের মুখ পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে কোয়ারি এলাকায় লুটপাট ঠেকাতে হলে এটি বাদ রাখা জরুরি ছিল। কিন্তু প্রশাসন তা করেনি।
ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। ভোলাগঞ্জ, গুচ্ছগ্রাম, কালাইরাগ, কালীবাড়ি এলাকার বাসিন্দারা জানান, ইজারার ভেতরে কালাসাদেক মৌজা থাকায় বালুখেকোরা সাদাপাথর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বৈধ ইজারার ছত্রছায়ায় সেখানেই শুরু হয় উত্তোলন। জুলাইয়ের শেষের দিকে টানা বর্ষণে যখন পানি বেড়ে যায় আর পর্যটক কমে যায়, তখনই দুই সপ্তাহ ধরে চলে বালু-পাথর লুট। পরে বিষয়টি মিডিয়ায় আসলে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। কিন্তু ততক্ষণে নীরব ছিলেন জেলা প্রশাসক। হৈচৈয়ের পর তিনি মাঠে নামলেও লুটের দায় নেননি। সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি দাবি করেন, প্রশাসন ব্যর্থ নয়, পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল কিন্তু কার্যকর হয়নি।
সাদাপাথরের পাশের রেলওয়ের সংরক্ষিত সম্পত্তি ‘বাঙ্কার’-ও এবার লুটের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। স্বাধীনতার পর থেকে নিরাপদ থাকা এলাকা এবার রেহাই পায়নি। স্থাপনা ভাঙচুর হওয়ায় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী দূরে সরে যায়, আর সুযোগ নেয় পাথরখেকোরা। স্থানীয়রা জানান, বাঙ্কার ছাড়াও কোয়ারি এলাকার কালাইরাগ, কালীবাড়ি, কলাবাড়ি এলাকাতেও চলেছে পাথরের হরিলুট। প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। লোকবল সংকটের অজুহাতে পুলিশও দায় এড়িয়েছে। এদিকে সংশ্লিষ্ট ইউএনও আজিজুন্নেছাও রহস্যময় নীরব ছিলেন। ফলে শারপিনটিলা, সাদাপাথরসহ বিভিন্ন এলাকায় লুট ঠেকানো যায়নি।
গত দুই মাস ধরে আলোচনায় ছিল গোয়াইনঘাটের রয়্যালটি ঘাট। জৈন্তাপুরের সারি-১ বালুমহালের ইজারাদার কামরুল ইসলামের পক্ষে ঘাট বসান আলোচিত বালুখেকো স্ট্যালিং তারিয়াং, জাহিদ খান, জিয়ারত খান প্রমুখ। গোয়াইনঘাট সদরে ঘাট বসানোর সুযোগে মৌসুমজুড়ে জাফলংয়ে হয়েছে অবাধ লুটপাট। একাধিক অভিযোগ জেলা প্রশাসকের কাছে উঠলেও কোনো ব্যবস্থা হয়নি। বরং লেঙ্গুরা গ্রামের প্রতিবাদকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে নির্যাতন করা হয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
‘টাঙ্গাইল সিন্ডিকেট’ নামের এক চক্রের সঙ্গেও ডিসি মুরাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। জাহিদ খান ও জিয়ারত খানের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। এদের দাপটে এমনকি জাফলং সফরকালে দুই উপদেষ্টার গাড়িবহর পর্যন্ত আটকে দেওয়া হয়। প্রতিবাদী বিএনপি নেতা রিয়াজউদ্দিন তালুকদারকে একের পর এক মামলায় জড়িয়ে বিপর্যস্ত করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন—বালু লুটের প্রতিবাদ করায় স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা তোফায়েল ও এসআই উৎসবের ইন্ধনে এসব মামলা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে ইজারাদার কামরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, প্রশাসনের মৌখিক অনুমতি নিয়েই তারা জৈন্তাপুরের পরিবর্তে গোয়াইনঘাটে ঘাট বসিয়েছেন। তবে জাফলং লুটের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
জেলা প্রশাসক মুরাদকে প্রত্যাহারের খবরে স্বস্তি ফিরেছে সিলেটে। পরিবেশ আন্দোলন-বাপা’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কীম বলেন, বিদায়ী ডিসি অযোগ্যতা ও অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা জরুরি। না হলে পাথরখেকোরা পিছু হটবে না। বেলা’র সিলেট সমন্বয়ক এডভোকেট শাহ সাহেদা আক্তার বলেন, বালু ও পাথর লুটে প্রশাসনের অলিখিত সমর্থন ছিল। এজন্যই এ বিপর্যয় ঘটেছে। আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার চিন্তা চলছে। তবে বর্তমানে প্রশাসন কাগজপত্রেও সহযোগিতা করছে না। সুজন সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ডিসিসহ যারা ব্যর্থ হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে কেউই এ ধরনের অপরাধ ঠেকানোর সাহস করবে না।
তথ্যসূত্র: মানবজমিন
খবরওয়ালা/এমএজেড