মনিরুজ্জামান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ আগস্ট ২০২৫
‘হৃদয়ের নিভৃত কোণে বিন্দু বিন্দু করে জমে ওঠা অব্যক্ত অনুভূতিগুলোকে ভাষা দাও। অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে শব্দের বিন্যাসে বাক্যের সৃষ্টি করো।’ এমনি আরও অনেক কথা জহির রায়হার লিখেছেন তাঁর আত্মকথায়।
জহির রায়হান নিজে যেমন নিখোঁজ হয়েছেন। তার অনেক লেখাও তাঁর মতো নিখোঁজ হয়েছে জানতাম। কেবল জানতে পারলাম না তিনি কীভাবে কার হাতে নিহত হয়েছেন। কেন তাকে হত্যা করা হলো? কিন্তু জহির রায়হান নিজে আত্মজীবনী বা আত্মকথা লিখেছেন এবং তা আমি পড়তে পারব এমন ধারণা আমার ছিল না। তাঁর লেখা ‘আত্মকথা’ পড়ে তাঁর সম্পর্কে নতুন কিছু জানতে পারলাম।
বায়ান্ন সালে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। পকেটে কাগজ-কলম, হাতে ছিল ক্যামেরা। এ কি ছিল তার অপরাধ? একদিন তার লেখা আত্মকথার মতো প্রকাশিত হবে নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ।
বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ কথাসাহিত্যিক জহির রায়হান। তিনি একাধারে সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন বলে কোন প্রকার সঞ্চয়ে তার আস্থা ছিল না। তিনি নিজেই লিখছেন, ‘সঞ্চয়ে আমি বিশ্বাস করি না। তাই হয়তো নিজের লেখাগুলোকে যে সযত্নে সংগ্রহ করে রেখে দেব, তাও রাখিনি।’ আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা তাঁর সেই সকল লেখা পাঠ করা থেকে বঞ্চিত হয়েছি।
তিনি তার আত্মকথায় লিখেছেন, ‘আমি আমার আবেগের ক্রীতদাস। আমার আবেগ আমাকে যখন যেখানে নিয়ে যায়, আমি সুবোধ বালকের মতো তাকে সেখানে অনুসরণ করি।’ পাঠকদের বলে রাখি জহির রায়হানের এই আবেগ এন্টিগোনির বাসনার নাম মাত্র। এন্টিগোনি মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও যে কর্ম সম্পাদন করেছিলেন জহির রায়হান তার আবেগের ডাকে সাড়া দিয়ে মৃত্যুকে উপেক্ষা করে সেই কাজ করেছেন।
লেখকের মুখে শুনলেই ভালো হয়, ‘আমার আবেগকে আমি আমার প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। সে যদি বলে, ভাঙো, ভাঙি। ভেঙে সব চুরমার করে দিই। সে যদি বলে গড়ো। আবার গড়ার কাজে লেগে যাই।
বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। সে (আবেগ) বলেছিল, ওই হিংস্র দানবের মুখোশগুলো খুলে ফেলো। ভেঙে ফেলো ফেরাউনের দুরাশার স্বর্গ। নইলে তোমার কণ্ঠ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাবে।’ ভাষার জন্য লড়াই করেছেন তিনি। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে লিখেছেন ‘আরেক ফাল্গুন’ নামের উপন্যাস।
এই আবেগই তাকে নিয়ে গেছে কথাসাহিত্যের জগৎ থেকে চলচ্চিত্রের জগতে। এই জগতে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ভালো-মন্দকে পাশাপাশি থাকতে দেখেছেন।
১৯৫৭ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজের মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে জহির রায়হানের পদার্পণ ঘটে।
১৯৭০ সালে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনকে রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায়। আজকাল অনেক চলচ্চিত্র গবেষকের মুখে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’র কথা শুনি কিন্তু ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমার কথা বলতে শুনি না। তারা এ কথাও বলেন জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাটি জনমানুষের হৃদয়স্পর্শ করতে পারেনি।
তাদের এ কথা বলার অন্যতম কারণ হচ্ছে তাদের ক্বেবলা পাকিস্তান। তারা কখনোই স্বাধীন বাংলাদেশ চায়নি আর চাইবেও না। তারা আয়ুব খানের শাসনকে স্বৈরশাসন বলতে কষ্ট পায়।
‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমার কাহিনি গড়ে উঠেছে বাংলার অতি সাধারণ একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে। পরিবারে দুই ভাই আনিস ও ফারুক, বড়বোন রওশন জামিল এবং বোনের স্বামী খান আতাউর রহমান। বড়বোন রওশন জামিল বিবাহিত। তিনি থাকেন বাবার বাসাতেই। তার স্বামী অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির।
সংসারের সব ক্ষমতা রওশন জামিলেরই হস্তগত। এই ক্ষমতার অপব্যবহার করেই তিনি তার স্বামীসহ নিজের দুই ভাইদের উপর একরকম স্বৈরশাসন চালিয়ে থাকেন। তিনি নিজের আঁচলে চাবির গোছা নিয়ে ঘোরেন। পেছনে পেছনে পানের বাটা নিয়ে ঘোরে বাড়ির গৃহপরিচারিকা। তার দোর্দণ্ড প্রতাপে অস্থির সবাই।
তৎকালীন পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদেরই মূলত রূপক আকারে এ চরিত্রটিতে ফুটিয়ে তুলেছেন জহির রাহান। রওশন জামিলের স্বামী খান আতাউর রহমান আদালতের কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। খান আতাউর রহমান তার এক বন্ধুর পরামর্শে তার শালা শওকত আকবরের বিয়ে ঠিক করেন।
পাত্রী সাথী নামের এক শান্তশিষ্ট মেয়ে। কিন্তু রওশন জামিল সম্পূর্ণ বেঁকে বসলেন। তিনি তার ভাইয়ের বিয়ে দিতে একদমই নারাজ। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে সংসারের চাবি না আবার তার হাত ফস্কে নতুন বউয়ের হাতে চলে যায়। ফলশ্রুতিতে রওশন জামিলকে না জানিয়েই তার ভাইয়ের বিয়ে দিয়ে দেন খান আতাউর রহমান।
সাথী বউ হয়ে ঘরে আসলে তার উপর রওশন জামিলের অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে। অপর দিকে সাথীর ছোট বোন বীথির প্রেমে পড়ে যান ফারুক। দুলাভাই আর বড় ভাই অনুমতি দিলে বীথিকে বিয়ে করে ফেলেন তিনিও। সাথী এবং বীথির বড় ভাই আনোয়ার হোসেন।
আনোয়ার হোসেন ছিলেন রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী। স্বাধিকারের আন্দোলনে তিনি কারারুদ্ধ হন। অন্যদিকে সাথীর নেতৃত্বে বাড়ির সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। নিজেদের বাড়ির ভেতরেই দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগানো হয়। রওশন জামিলের চাবির গোছা চলে আসে দুই বোনের কাছে। পানের বাটা ঘুরতে থাকে তাদের পেছনে পেছনে। ক্ষমতা হারিয়ে পাগলের মত হয়ে যান রওশন জামিল।
ক্ষমতা হারিয়ে নতুন নতুন ষড়যন্ত্র করতে শুরু করেন তিনি। এরই মাঝে সাথী ও বীথি সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়লে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।দুর্ভাগ্যক্রমে মৃত সন্তান জন্ম দেয় সাথী। ডাক্তার আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে এ শোক হয়তবা সাথী সহ্য করতে পারবে না। তাই বীথির সন্তানকে তুলে দেয়া হয় তার কোলে। নিজের সন্তান ভেবে তাকে লালন পালন করতে শুরু করে সাথী।
রওশন জামিল ষড়যন্ত্র করে দুই বোনের মাঝে বিবাদ বাঁধিয়ে দেয়। কৌশলে বীথিকে বিষ খাওয়ান তিনি আর সেই দোষ চাপান সাথীর উপর। বীথি সুস্থ হয়ে বেঁচে উঠলেও বিষ খাওয়ানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হয় সাথী। আদালতে মামলা উঠলে নিজের স্ত্রীকে দোষী মনে করে শওকত আকবর তার বিরুদ্ধে মামলা লড়েন, আর সাথীর পক্ষের উকিল হন খান আতাউর রহমান। খান আতাউর রহমান আদালতে প্রমাণ করে দেন যে তার নিজের স্ত্রী রওশন জামিলই আসলে বিষ প্রয়োগের মূল হোতা।
‘কখনো আসেনি’ জহির রায়হানের প্রথম ছবি। ছবির বিষয়বস্তু এদেশের মানুষের চিন্তায় ধরা পড়েনি। ছবির মূল বিষয় ছিল, সৌন্দর্য এবং সৌন্দর্য উপাসকদের বাস্তব চিত্র। সৌন্দর্য চিরকাল সে নিজের গুণেই সৌন্দর্য। সে কখনো উপাসকের উপর নির্ভরশীল নয়। উপাসক সৌন্দর্যের পূজা করলেই সে সৌন্দর্য হবে এমন ধারণা ভ্রান্তি বিলাস মাত্র।
উপাসক স্বার্থপরের মতো তাকে পাওয়ার জন্য কেবল পূজা দিয়েই জীবন অবসান করে ফেলে। তাকে পাওয়ার যে লোভ, কামনা-বাসনা, এগুলোই তাকে সৌন্দর্যের কাছ থেকে চিরকাল দূরে সরিয়ে রাখে। ছবির যে প্রতিনায়ক তিনি লোভ, কামনা-বাসনার ঊর্ধ্বে বলে চিরকালই সে সৌন্দর্যের সহচারী। কেবল প্রতিনায়ক সঞ্জীব দত্ত নয় যে কেউ লোভ, কামনা-বাসনার ঊর্ধ্বে অবস্থার করতে পারবেন তিনিই হবেন সৌন্দর্যের সহচারী। সৌন্দর্যের রক্ষক।
ছবির কাহিনিটি দুুর্বোধ্য হওয়ায় সাধারণ মানুষ তা বুঝতে পারেনি। আর যা মানুষ বুঝতে পারেনি তা চলবে কি করে?
রায়হান নিজেই লিখছেন, ‘আমার প্রথম তিনটি ছবি কখনো আসেনি, কাঁচের দেয়াল ও সোনার কাজল। এদেশ চলেনি।
চলেনি বলে আমার বন্ধুরা অনেক দুঃখ পেয়েছে।… আমাকে বলেছে বোকা কোথাকার। কী হবে এসব ছবি বানিয়ে। তার চেয়ে লোকে যেমনটি চায়, তেমনটি বানাও। কিছু টাকা-পয়সা রোজগার করো। তাই বানালাম, সঙ্গম। বাহানা। অবশেষে বেহুলা।’
তখনকার সময়ে বাণিজ্যের চাইতে বিবেকের কদরই ছিল বেশি। শিল্প-সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করাই ছিল পরিচালকদের মূল উদ্দেশ্য। ছবি নির্মাণে আগে ছিল সৌন্দর্যবোধ তার পেছনে বাণিজ্য। আজকাল ঠিক তার উল্টো। আগে বাণিজ্য তার পেছনে সৌন্দর্য। দেশের সংস্কৃতি ধ্বংস করতে এর চাইতে বেশি কিছুর প্রয়োজন হয় না।
জহির রায়হান যখন সঙ্গম, বাহানা, এবং বেহুলা চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেন তখনো নিন্দা মন্দের হাত থেকে রেহাই পায়নি। গোপনে তার বন্ধুরা বলেছেন, ‘আহা! জহিরটার এত অধঃপতন হবে ভাবিনি।’ যে পরিবেশে তিনি কাজ করেছেন সেখানে দেখেছেন, সত্যের চেয়ে মিথ্যার, আসলের চেয়ে নকল, হীরার চেয়ে কাচের মূল্য বেশি। অন্য সবাই কি দেখছেন জানি না। আমি বর্তমানে তাই দেখছি।
জন্মদিনে তাঁর জীবন ও কর্মের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক, সহ-সম্পাদক, খবরওয়ালা।