খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৯ আগস্ট ২০২৫
২৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়—হাত-পা রশি দিয়ে বাঁধা রিপন ব্যাপারী (৫০), আর নির্মমভাবে তাঁর চোখ উপড়ে ফেলা হচ্ছে। পুরুষদের পাশাপাশি দুই নারীও সেই কাজে অংশ নেন। অসহায়ভাবে ছটফট করলেও কেউ তাঁকে রক্ষা করেনি। বর্তমানে তিনি ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন।
রিপনের অভিযোগ, জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাঁর দুই ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, মেয়ে ও অন্যান্য স্বজনেরা তাঁর চোখ উপড়ে ফেলেছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন তাঁর ৮০ বছরের বাবাও। রিপনের মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে দা দিয়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন—তিনি আর কখনোই চোখে দেখতে পারবেন না।
ঘটনাটি ঘটে ২২ আগস্ট গভীর রাতে বরিশালের মুলাদীতে রিপনের নিজ বাড়িতে। রিপনের দাবি, ভাইয়েরা তাঁর টাকায় কেনা জমি নিজেদের নামে দলিল করে নিয়েছিল। দীর্ঘদিন তাঁরা জমির ফসলও ভোগ করে আসছিল। সেই জমির হিসাব মেটাতে গিয়েই তাঁর ওপর নির্মম হামলা চালানো হয়।
ভিডিওতে হামলাকারীদের বলতে শোনা যায়—“ধরছ না কেন, মারস না কেন।” রিপনের স্ত্রী নূরজাহান বেগম জানান, শ্বশুর-শাশুড়ি ও ভাইদের অত্যাচারে স্বামী অনেক বছর পরিবার থেকে দূরে ছিলেন। ঢাকায় রিকশা চালিয়ে সংসার চলত; স্ত্রী মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন, দুই ছেলেও রিকশাচালক।
২২ আগস্ট বাড়ি গেলে তর্কবিতর্কের পর রাতে রিপনকে রশি দিয়ে বেঁধে দা দিয়ে কোপানো হয় এবং শেষে চোখ উপড়ে ফেলা হয়। আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাঁকে মুলাদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলেও চিকিৎসক না থাকায় ভর্তি করা হয়নি। পরদিন বরিশালের শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, পরে ঢাকায় আনা হয়।
২৫ আগস্ট রিপনের স্ত্রী নূরজাহান বেগম বরিশালের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। আসামি করা হয়েছে রিপনের বাবা আর্শেদ ব্যাপারী, ছোট ভাই স্বপন ব্যাপারী, বড় ভাই রোকন ব্যাপারী, রোকনের স্ত্রী নুরনাহার বেগমসহ আটজনকে। মামলায় উল্লেখ আছে—রিপনের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা নেওয়া হলেও জমি ফেরত দেওয়া হয়নি।
হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন—তাঁর দুই চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট। মৃত টিস্যু সরিয়ে সিলিকন বল বসানো হয়েছে, পরে কৃত্রিম চোখের মতো ডিভাইস দেওয়া হবে, তবে দৃষ্টিশক্তি আর ফেরানো যাবে না। এমন নৃশংস ঘটনার নজির চিকিৎসকেরা আগে দেখেননি।
রিপনের ছেলে শাহেদুল ইসলাম জানান—ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা গেছে, তাঁর চাচা রোকন ব্যাপারী চোখ উপড়ে নিচ্ছেন, আর দাদা নির্দেশ দিচ্ছেন। তিনি ন্যায়বিচারের দাবি জানান এবং বলেন, “এমন পরিবারে জন্ম নিয়েছি বলে ঘৃণা হচ্ছে।”
স্বজনদের অভিযোগ—মামলার আসামি স্বপন ব্যাপারীকে গ্রেপ্তার করা হলেও অন্যরা পলাতক। নূরজাহান বেগম সমাজের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, “স্বামী অপরাধ করে থাকলেও আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারত, চোখ উপড়ে ফেলার মতো হিংস্রতা কেন?”
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন—সরকারি খরচে রিপনের চিকিৎসা চলছে এবং বাইরে করানো পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচও হাসপাতালের সমাজসেবা বিভাগ বহন করবে। তবে রোগী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং তাঁকে কাউন্সেলিং দেওয়া হয়েছে।
নূরজাহান বেগমের আক্ষেপ—“চোখ না তুলে হাত কেটে দিত, তবু কষ্টটা কম হতো। এখন স্বামীকে এই অবস্থায় রেখে সংসার চালানোই অনিশ্চিত হয়ে গেছে।”
খবরওয়ালা/এন